ব্যাংকঋণ পেতে ব্যবসায়ীদের যেসব প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন

0

মোশারফ হোসেনঃ ব্যাংকের একশ্রেণির গ্রাহক ব্যাংকে টাকা আমানত রাখেন, আরেক শ্রেণির গ্রাহক ব্যাংক থেকে টাকা ঋণ নেন। তবে এই দুই প্রধান শ্রেণির গ্রাহকদের মধ্যে ঋণ নেয়া গ্রাহকরাই হচ্ছে ব্যাংকের আয়ের প্রধান সহযোগী। কিন্তু প্রধান আয়-সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও ঋণ চাওয়া সব গ্রাহককেই ব্যাংক ঋণ প্রদান করে না।

প্রথম কারণ হচ্ছে, কোনো গ্রাহক যখন ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন, তখন কিন্তু তিনি ব্যাংকের কোনো ‘ব্যক্তি ব্যাংকার’-এর কাছে টাকা রাখেন না, তিনি টাকা রাখেন মূলত ‘প্রতিষ্ঠান ব্যাংক’-এর কাছে। অর্থাৎ স্বয়ং ব্যাংক নিজেই গ্রাহকের আমানতের গ্যারান্টার হিসেবে কাজ করে। তাই সামান্য একটি কাগজের জমা সিøপের কার্বন কপিকে প্রমাণ মেনে একজন গ্রাহক ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা জমা রাখেন। কিন্তু এই একই গ্রাহক যখন কোনো কারণে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চান, তখন তাকে অনেক ডকুমেন্টস সরবরাহ করার পাশাপাশি দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অর্থাৎ তিনি যেভাবে বা যত সহজ শর্তে ব্যাংককে টাকা দিয়েছেন, ব্যাংক কিন্তু সেই একই পদ্ধতিতে বা সহজ শর্তে তাকে ঋণ প্রদান করেন না। এর কারণ হচ্ছে ব্যাংকের গ্যারান্টি যতটা স্বীকৃত ও নির্ভরযোগ্য, একজন ব্যক্তির গ্যারান্টি কিন্তু ততটা স্বীকৃত ও নির্ভরযোগ্য নয়। এছাড়া ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংককে দেশের প্রচলিত আইন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধান ও নির্দেশনা অনুসরণ ও পরিপালন করে ঋণ প্রদান করতে হয়। তাই একজন ব্যক্তি বা সাধারণ প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়ার সময় ব্যাংক তার/ তাদের কাছে লম্বা ফর্দে কাগজপত্র চাওয়ার পাশাপাশি কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে যেতে বলে।

কোনো কোনো গ্রাহক কিছু কিছু মানদণ্ডে কোয়ালিফাইড হন। একইসঙ্গে এসব গ্রাহকের কেউ কেউ হয়তো ব্যক্তি হিসেবেও নিঃসন্দেহে সৎ ও ধার্মিক, তার ব্যবসাও ভালো, স্টক পজিশন চোখে পড়ার মতো, টার্নওভারও (সেলস) সন্তোষজনক, এমনকি ঋণের জামানতও অফার করেন খুব মূল্যবান। কিন্তু এরপরও ব্যাংক কখনও কখনও এসব গ্রাহককেও ঋণ দিতে অপারগতা জানায়। কারণ হচ্ছে ব্যাংকের গ্রাহকদের বড় একটা শ্রেণি কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া এবং কোনো কাগজপত্র জোগাড় ব্যতিরেকেই ব্যাংকে ঋণ চান। তারা হঠাৎ করেই কোনো একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বা ব্যবসায় থেকে বেরিয়ে যাওয়া মূলধনের পুনঃসংস্থান করতে ব্যাংকঋণের চিন্তা করেন।

ব্যাংক তখন ঋণ দেয়া তো দূরের কথা, তাদের ঋণের বিষয়ে কোনো আশ্বাসও দেওয়া যায় না। এসব গ্রাহকদের একটি অংশকে তাই প্রায়ই ব্যাংকের বিরুদ্ধে অসত্য অভিযোগ করতে দেখা যায়- ‘ব্যাংক ঋণ দেয় না, বা ব্যাংক তেলে মাথায় তেল দেয়’ প্রভৃতি। কিন্তু আপনার জানা উচিত ব্যাংকঋণ পেতে আপনার সাধারণ কিছু যোগ্যতার পাশাপাশি কিছু পূর্বপ্রস্তুতিও থাকা প্রয়োজন। যেমন-

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ (A Platform for Bankers Community) প্রিয় পাঠকঃ ব্যাংকিং বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ এ লাইক দিন এবং ফেসবুক গ্রুপ ব্যাংকিং ফর অল এ জয়েন করে আমাদের সাথেই থাকুন।

এক. আপনার ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স আছে কি? যদি না থাকে আজই আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ট্রেড লাইসেন্স করুন ও করপোরেট সিল বানিয়ে নিন।
দুই. ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকে প্রাতিষ্ঠানিক চলতি অ্যাকাউন্ট খুলুন।
তিন. অ্যাকাউন্ট খুলতে আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি কোনো ব্যাংক শাখা বেছে নিন, যেখানে সহজে ও স্বল্প সময়ে যাতায়াত করা যায় এবং প্রতিদিনই চাইলে একাধিকবার টাকা জমা ও উত্তোলন করতে পারবেন।
চার. সব ব্যবসায়িক লেনদেন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে করুনআপনার কাস্টমারদের সঙ্গে না পারলেও অন্তত সাপ্লাইয়ারদের সঙ্গে করুন। কোনো সাপ্লাইয়ারকে পেমেন্ট করার আগে যদি দেখেন, আপনার অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্স নেই, কিন্তু হাতে ক্যাশ আছে, এক্ষেত্রে নিজের কাছে থাকা ক্যাশ আগে নিজের অ্যাকাউন্টে জমা করুন। এরপর অনলাইন/ ইএফটি/ আরটিজিএস/ ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সাপ্লাইয়ারের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করুন। এতে একদিকে আপনার হিসাবের ক্রেডিট সামেশন বাড়বে এবং একইসঙ্গে ডেবিট সামেশনও বাড়বে। অথবা সাপ্লাইরকে চেক ইস্যু করে দিয়ে তাদের তা কালেকশন করিয়ে নিতে বা সরাসরি ব্যাংকে গিয়ে নগদ উত্তোলন করে নিতে অনুরোধ করুন। সাপ্লাইয়ারকে বোঝান, তিনিও তো কোনো না কোনো ব্যাংকের গ্রাহক, হয়তোবা ঋণ গ্রহীতাও। তাই ব্যাংক-টু-ব্যাংক বা অ্যাকাউন্ট-টু-অ্যাকাউন্ট লেনদেন করলে আপনার অ্যাকাউন্টেরও স্বাস্থ্য ভালো হবে, একইসঙ্গে তার অ্যাকাউন্টেরও স্বাস্থ্য ভালো হবে। এতে করে আপনারা উভয় পক্ষই লাভবান হবেন আপনাদের উভয়েরই ব্যাংকিং ইমেজ উন্নত হবে।

পাঁচ. অনেক ব্যবসায়ী গ্রাহকরাই লেনদেন কম বা লেনদেন না করতে পারার কারণ হিসেবে বলেন, ‘তার সাপ্লাইয়ার ভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহক। তাই সেই ব্যাংকের কোনো শাখায় গিয়ে তাকে সরাসরি অনলাইন করতে হয়, অথবা সাপ্লাইয়ারকে সরাসরি নগদ পেমেন্ট করতে হয়।’ কিন্তু বর্তমানে ইএফটি, আরটিজিএস ও অ্যাপ/ওয়েবভিত্তিক ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের যুগে এসব মরা যুক্তি আর চলে না। আপনার সাপ্লাইয়ার ভিন্ন ব্যাংকের হলেও তার পক্ষে ইএফটি/ আরটিজিএস বা ওয়েব/ মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পেমেন্ট করা সম্ভব। এর ফলে লেনদেন করতে না পারার অজুহাত এখন আর গ্রহণযোগ্য হয় না।
ছয়. যেসব সাপ্লাইয়ার ব্যাংক-টু-ব্যাংক লেনদেন করে, এমন সাপ্লাইয়ার বাছাই করুন।
সাত. আপনার ব্যাংকের সঙ্গে অ্যাকাউন্ট আছে, ব্যবসা করার জন্য এমন সাপ্লাইয়ার বাছাই করুন।
আট. আপনার সাপ্লাইয়ার ভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহক হলে তাকে আপনার ব্যাংকেও অ্যাকাউন্ট খুলতে মোটিভেট করুন।
নয়. যদি বিশেষ কারণে অ্যাকাউন্ট টাচ না করিয়ে সরাসরি নগদ অনলাইন করে সাপ্লাইয়ারকে পেমেন্ট করতে হয়, তাহলে নগদ অনলাইন জমার ডিপোজিট স্লিপ সংরক্ষণ করুন।

দশ. আপনি নিজেও আপনার পরিচিত ও নিয়মিত কাস্টমারদের কাছ থেকে নগদ না নিয়ে চেকে পেমেন্ট নিতে পারেন।
এগারো. ব্যাংকের অ্যাপভিত্তিক ডিজিটাল ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে আপনি আপনার সাপ্লাইয়ারদের মতো কাস্টমারদের কাছ থেকেও তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট (বিকাশ/ নগদ/ রকেট প্রভৃতি) থেকে সরাসরি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টেই টাকা ট্রান্সফার করতে পারেন সহজেই।
বারো. কেনাবেচার ডকুমেন্টেড করুন সব ক্রয়-বিক্রয়ের চালান/ ক্যাশ মেমো সংরক্ষণ করুন। ব্যবসার সব আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষণ করুন।
তেরো. ব্যক্তিক অ্যাকাউন্টে ব্যবসায়িক লেনদেন করবেন না, কারণ ব্যাংক ব্যক্তিগত লেনদেনকে ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে গ্রহণ করবে না।
চৌদ্দ. আপনার ব্যাংক হিসাব বিবরণী আপনার ব্যবসার স্টক ও টার্নওভারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অর্থাৎ ব্যবসার স্টক পজিশন, টার্নওভার ও ব্যাংক লেনদেনের একই সুরে কথা বলতে হবে। আপনার স্টক পজিশন অনেক ভালো, আপনি মুখে বলছেন, আপনার বার্ষিক টার্নওভার (সেলস) পাঁচ কোটি টাকা, কিন্তু সর্বশেষ এক বছরে অ্যাকাউন্টে মোট জমা (ক্রেডিট সামেশন) মাত্র ৫০ লাখ টাকা! এত বিরাট ব্যবধান ব্যাংকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই ব্যাংক আপনার অ্যাকাউন্টের ক্রেডিট সামেশনকেই বার্ষিক টার্নওভার ধরে নেবে। তাই প্রকৃত টার্নওভারের চেয়ে অ্যাকাউন্টের ক্রেডিট সামেশন যদি কিছুটা কম হয়েও থাকে, সেই গ্যাপের পক্ষে ডকুমেন্টস (যেমন চালান, ক্যাশ মেমো, নগদ অনলাইন জমা ভাউচার প্রভৃতি) সংরক্ষণ ও ব্যাংকে উপস্থাপন করুন।

পনেরো. আপনি কোনো কোম্পানির ডিলার হলে নিয়োগপত্র/ চুক্তিপত্রের কপি বা ডিলারশিপ সার্টিফিকেট নিয়ে রাখুন।
ষোলো. আপনার সাপ্লাইয়ারদের সঙ্গে সম্ভব হলে নির্দিষ্ট ডিলার কোডে লেনদেন করুন এবং বছরান্তে বা ব্যাংকের চাহিদামতো সাপ্লাইয়ারের কাছ থেকে বার্ষিক ক্রয়ের/ অর্ডারের বিবরণী চেয়ে নিন।
সতেরো. সাপ্লাইয়ার কর্তৃক কোনো মাসিক/ বার্ষিক বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা থাকলে, লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জন উল্লেখপূর্বক প্রতিবছর সার্টিফিকেট নিয়ে রাখুন।
আঠারো. দৈনিক বিক্রয় রেজিস্টার, স্টক রেজিস্টার ও দেনাদার রেজিস্টার সংরক্ষণ করুন (মোবাইল অ্যাপ বা কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিও ব্যবহার করতে পারেন)।

উনিশ. মাসিক/ বার্ষিক লাভ-ক্ষতির হিসাব রাখুন।
বিশ. এনআইডি, ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, দলিল, নামজারি প্রভৃতি ক্ষেত্রে নামের ভিন্নতা থাকলে সংশোধন করুন।
একুশ. দোকান/ গোডাউন/ ব্যবসায়ের পজেশন ভাড়ার লিখিত চুক্তি করুন (নির্দিষ্ট মূল্যমানের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে)।
বাইশ. ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াও অন্য কোনো ম্যানডেটরি রেগুলেটরি লাইসেন্স বা কাগজপত্র (যেমন পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, বিএসটিআই সনদ প্রভৃতি) প্রযোজ্য হলে তাও সংগ্রহে রাখুন।

তেইশ. দোকানে/ গোডাউনে সাইনবোর্ড নিশ্চিত করুন।
চব্বিশ. সাইনবোর্ডে লেখা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, করপোরেট সিল, ডিলারশিপ সার্টিফিকেট/ চুক্তি, চালান ও ক্যাশ মেমো প্রভৃতি বিষয় উল্লিখিত নামের সঙ্গে অভিন্ন হতে হবে।
পঁচিশ. সব ব্যবসায়িক ও ব্যাংকিং ডকুমেন্টস (ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন সনদ, ভ্যাট সনদ, চেকবই, জমাবই ইত্যাদি) নির্দিষ্ট একটি ফাইলে রাখুন।
ছাব্বিশ. ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার প্রমাণ হিসেবে পুরোনো ট্রেড লাইসেন্স (অন্তত তিন বছরের) সংরক্ষণ করুন।
সাতাশ. কারও ঋণের গ্যারান্টর হওয়ার আগে আরেকবার ভাবুন, কারণ অন্যের ঋণের গ্যারান্টার হলেও সিআইবি রিপোর্ট তা আপনার গ্যারান্টেড দায় হিসেবে দেখাবে। আর আপনি যার ঋণের গ্যারান্টি দিয়েছেন, তিনি খেলাপি হলে আপনার সিআইবি বিবরণীও খেলাপি হবে, যা আপনার ঋণপ্রাপ্তির জন্য প্রতিবন্ধক হবে।

আটাশ. অনেকে আছেন যাদের কোনো ব্যবসা/ কর্মসংস্থান নেই, আয়ও নেই। এমন অনেকেই ব্যাংকে এসে বাড়ি বা জমির দলিল জমা রেখে ঋণ পেতে চান। এমনটা সম্ভব নয়, কারণ ব্যাংক ব্যক্তি বা জামানতসর্বস্ব ঋণ দেয় না। ঋণ পেতে হলে ঋণের একটি প্রকৃত ও গ্রহণযোগ্য উদ্দেশ্য থাকতে হবে, যেখানে ঋণের টাকা বিনিয়োজিত হবে। দলিলদস্তাবেজ জমা নিয়ে উদ্দেশ্যবিহীন কোনো বিনিয়োগ ব্যাংক করে না। ঋণের জামানতের চেয়েও বড় হচ্ছে ঋণের উদ্দেশ্য।
ঊনত্রিশ. বাড়ি/ জমিজমা বন্ধক রেখে ঋণ নিতে চাইলে সিএস খতিয়ান থেকে শুরু করে সর্বশেষ খতিয়ান পর্যন্ত সব খতিয়ানের সার্টিফাইড কপি, সব ভায়া দলিলের মূল/ সার্টিফাইড কপি, মৌজা ম্যাপ ও কলমিনকশা সংগ্রহে রাখুন। যদি সর্বশেষ খতিয়ান আপনার নামে না হয়ে থাকে, তাহলে নামজারি ছাড়া জমি বন্ধক দিতে পারবেন না, কারণ নামজারি না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো জমি আনকালেক্টেড চেকের মতো চেক পেয়েছেন, কিন্তু টাকা পাননি (অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হয়নি)। নামজারি করিয়ে নামজারি খতিয়ানের মূল কপি, ডিসিআর, হাল সন পর্যন্ত খাজনা পরিশোধের রশিদও সংগ্রহে রাখুন।

অনেক প্রবাসী ছুটিতে দেশে এসে বা দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর দেশে ফিরে ব্যাংকের কাছে হাউস লোন চান। তাদের যখন প্রশ্ন করা হয়, আপনি প্রতি মাসে কেমন টাকা পাঠান- তখন তারা কেউ হয়তো বলেন, ‘এক লাখ’; কেউবা বলেন, ‘দুই লাখ।’ কিন্তু ব্যাংক যখন এসব টাকা পাঠানোর সত্যতা যাচাই করতে প্রবাসী বা প্রবাসীর স্বজনের হিসাব বিবরণী চেক করে, তখন এসব টাকা পাঠানোর কোনো রকম নজির দেখতে পায় না। প্রবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি টাকা অ্যাকাউন্টে না পাঠিয়ে হুন্ডিতে পাঠাতেন, কিংবা গোপন পিন নম্বর পাঠিয়েছেন। আবার এমনও হয়েছে, একেক সময় একেক জনের নামে টাকা পাঠিয়েছেন এবং হতাশার কথা হচ্ছে, এসব টাকা পাঠানোর প্রমাণ হিসেবে কোনো মানি রিসিটও তার সংগ্রহে নেই। ফলে মাসিক আয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে না বলে ব্যাংক তাকে ঋণ প্রদানের আশ্বাস দিতে পারে না।

অনেকে ব্যাংকে এসে বলেন, ‘আমার কাছে ১০ লাখ টাকা আছে। আমি ব্যাংক থেকে আরও ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ করতে চাই।’ ব্যাংকের ভাষায় গ্রাহকের কাছে থাকা ১০ লাখ টাকাকে গ্রাহকের ‘ইকুইটি’ বলা হয়। কিন্তু ব্যাংক যখন বলে, ‘ওই ১০ লাখ টাকা কোথায় আছে, বা ওই ১০ লাখ টাকা আমার ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে জমা রাখুন,’ তখন গ্রাহক টাকার কোনো সংস্থান বলতে পারেন না। ফলে শুরুতেই তিনি ব্যাংকের বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। একইসঙ্গে ঋণ প্রাপ্তির জন্যও অযোগ্য বলে বিবেচিত হন।

ব্যাংকঋণ প্রাপ্তির যোগ্যতার মোট স্কোর যদি ১০০ নম্বরের হয়, তাহলে এই ১০০ নম্বরের মধ্যে ৫০ নম্বরই নির্ধারিত হবে আপনার হিসাব বিবরণী দিয়ে; বাকি ২৫ আপনার পার্সোনাল ইন্টেগ্রিটি ও ২৫ হচ্ছে ঋণের বিপরীতে জামানত। তাই এখন হিসাব কষে দেখুন, ব্যাংক লেনদেনের গুরুত্ব কতটুকু।

আপনাকে মনে রাখতে হবে, স্থানীয় ব্যাংক ম্যানেজার হয়তো আপনাকে চেনেন, জানেন, আপনার সামাজিক অবস্থান সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল আছেন; কিন্তু ঋণটি যখন প্রধান কার্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত হয়, তখন স্থানীয় শাখা/ ম্যানেজার আপনার ও ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের মাঝে কেবল একজন এজেন্টের ভূমিকা পালন করে। প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট কমিটির বিজ্ঞ ব্যাংকাররা আপনাকে চেনেন না, কখনও দেখেননি। ম্যানেজার সাহেব আপনার সম্পর্কে যত গুণগানের কথাই লিখুন না কেন, ঋণ অনুমোদনকারী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কেবল আপনার অ্যাকাউন্টের লেনদেন আর ঋণের বিপরীতে আপনার জমাকৃত বিভিন্ন ডকুমেন্টস আর কাগজপত্রের ভিত্তিতেই আপনার ঋণের মেরিট বিচার করবে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে কথা বলে আপনার হিসাব বিবরণী। আপনার হিসাব বিবরণীই আপনার ঋণপ্রাপ্তির পক্ষে-বিপক্ষে সবচেয়ে বড় সনদ।

আরও দেখুন:
জেনে নিন যে ১০টি ভুলে পারসোনাল লোন হয় না
জামানত নিয়ে ব্যাংকের বিড়ম্বনা ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

তাই যাবতীয় আর্থিক লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে করার কোনো বিকল্প নেই। আপনি প্রকৃত ব্যবসায়ী হলে, ব্যবসার সামর্থ্যরে সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ব্যাংক লেনদেন থাকলে আপনার ব্যাংক আপনাকে ঋণ না দিলেও অন্য কোনো না কোনো ব্যাংক নিশ্চয় দেবে। আপনি আপনাকে সুসংগঠিত রাখুন। হতে পারে একদিন আপনার এলাকার কোনো ব্যাংকই আপনাকে খুঁজে নেবে, তাদের বিনিয়োগ পার্টনার হতে অনুরোধ করবে।

মোশারফ হোসেন: ব্যাংক কর্মকর্তা ও ফ্রিল্যান্স লেখক।

Leave a Reply