ব্যাংকে মুনাফা কম তাই বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্র কিনছেন

0

রাজধানীর টিকাটুলির বাসিন্দা দিপালী রানী রায় নিজের জমানো তিন লাখ টাকা বেসরকারি একটি ব্যাংকে ফিক্স ডিপোজিট করেছিলেন। যেখান থেকে প্রতি তিন মাস অন্তর সুদ তুলতেন সাড়ে সাত হাজার টাকা। সুদের হার কমিয়ে এখন ব্যাংক অফার করছে তিন মাস অন্তর দেবে মাত্র চার হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক। তাই ফিক্স ডিপোজিট ভেঙে এখন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করবেন।

অনেকে এখন ব্যাংকের সুদহার কমায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকে নিরাপদ মনে করছেন। ফলে মহামারি ও বিনিয়োগে নানা শর্তের পরও বাড়তি মুনাফার আশায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ছে। চলতি ২০২০-২০২১ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) সঞ্চয়পত্র নিট বিক্রি হয়েছে সাত হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের চেয়ে বেশি। গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে নিট সঞ্চয়পত্রের বিক্রির পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৬৫৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, ব্যাংকে আমানতের সুদহার কম হওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ মনে করছেন। নিউজটি আপনি পড়ছেন ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ-এ। তাই বিভিন্ন শর্তপরিপালন করেও সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাধারণ মানুষের এখন অর্থ বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নেই। ব্যাংকে টাকা রাখে মুনাফার আশায়, সেখানে সুদহারও অনেক কম। আমানতে পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ সুদ অফার করছে। বিভিন্ন চার্জ যোগ করলে মুনাফা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হবে। তাই সাধারণ মানুষ বাড়তি মুনাফার আশায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রকে বেছে নিয়েছে। এসব কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়েছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মোট ১৭ হাজার ৫৫৭ কোটি ৯১ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর বিপরীতে মূল অর্থ পরিশোধ হয়েছে ১০ হাজার ১০২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। মূল অর্থ পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ নিট বিক্রি হিসেবে গণ্য হয়। সেই হিসেবে আলোচিত সময়ে নিট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাত হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। বছরের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়েছে ৫৫ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং নিট বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১০৪ শতাংশ। গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ১১ হাজার ৩০৫ কোটি ৭২ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। আর দুই মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৬৫৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ (Banking News Bangladesh. A Platform for Bankers Community.) প্রিয় পাঠকঃ ব্যাংকিং বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ এ লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

সঞ্চয় অধিদফতরের হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, একক মাস হিসেবে আগস্টে মোট আট হাজার ৮৫২ কোটি ২৯ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর বিপরীতে মূল অর্থ পরিশোধ হয়েছে পাঁচ হাজার ১০৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। সেই হিসাবে আগস্টে নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৭৪৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এর আগের মাস জুলাইয়ে মোট আট হাজার ৭০৫ কোটি ৬২ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে। ও সময় নিট বিক্রির পরিমাণ তিন হাজার ৭০৫ কোটি টাকা।

অধিদফতর সূত্রে জানা গে‌ছে, গত কয়েক বছর সঞ্চয়পত্র অস্বাভাবিক বিক্রি বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকার এ খাতের ওপর বেশ কয়েকটি বিধিনিষেধ আরোপ করে। আগে সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য কোনো ক্রেতাকে করশনাক্তকরণ নম্বর বা ই-টিআইএন জমা দিতে হতো না। কিন্তু এখন এক লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে করশনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দুর্নীতি কিংবা অপ্রদর্শিত আয়ে সঞ্চয়পত্র কেনা বন্ধ করতে ক্রেতার তথ্যের একটি ডাটাবেসে সংরক্ষণের লক্ষ্যে অভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিক্রি কার্যক্রম শুরু করেছে।

এছাড়া সঞ্চয়পত্রে বড় বিনিয়োগে কঠোর হয়েছে সরকার। চাইলেই ভবিষ্যৎ তহবিল বা প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থে সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ নেই। একইসঙ্গে পুরো বিক্রি কার্যক্রমটি এখন অনলাইনের মাধ্যমে মনিটর করায় কেউ ইচ্ছে করলে, সীমার অতিরিক্ত সঞ্চয়পত্র বা একই নামে বিভিন্ন জায়গা থেকে কিনতে পারবেন না। এতসব শর্তের পর গত অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি। কিন্তু ব্যবসায় মন্দা ও ব্যাংকগুলোতে আমানতের সুদহার কমে যাওয়ায় বেশি মুনাফার আশায় এখন বিভিন্ন শর্তপূরণ করেও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে সাধারণ মানুষ।

এদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। বিশাল ঘাটতি মেটাতে এবার সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। গত অর্থবছরের বাজেটে যার লক্ষ্য ছিল ২৭ কোটি টাকা। নিউজটি আপনি পড়ছেন ব্যাংকিং নিউজ বিডি ডটকম-এ। গেল অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। যা তার আগের অর্থবছরে ৪৯ হাজার ৯৩৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। সেই হিসাবে গেল অর্থবছরের সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমেছিল ৭১ দশমিক ১০ শতাংশ।

জানা গেছে, এর আগে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে সর্বশেষ ২০১৫ সালের মে মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদহার গড়ে ২ শতাংশ করে কমানো হয়েছিল। বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ, পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০১৫ সালের ২৩ মের পর থেকে এই হার কার্যকর আছে। এর আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ছিল ১৩ শতাংশেরও বেশি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোতে বিনিয়োগকৃত অর্থের ওপর একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর মুনাফা প্রদান করে সরকার। মেয়াদপূর্তির পর বিনিয়োগকৃত অর্থও ফেরত প্রদান করা হয়। প্রতিমাসে বিক্রি হওয়া সঞ্চয় স্কিমগুলো থেকে প্রাপ্ত বিনিয়োগের হিসাব থেকে আগে বিক্রি হওয়া স্কিমগুলোর মূল ও মুনাফা বাদ দিয়ে নিট ঋণ হিসাব করা হয়। ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেটে নির্ধারিত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের বিভিন্ন আমানতের স্কিমের ওপর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ৫ থেকে ৬ শতাংশ সুদ দিচ্ছে গ্রহকদের। সেই হিসাবে সঞ্চয়পত্রে টাকা রাখলে প্রায় দ্বিগুণ মুনাফা পাবেন বিনিয়োগকারীরা।

Leave a Reply