‘বন্ধকী’ ও ‘অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ প্রসঙ্গে ব্যাংকারদের জ্ঞাতব্য

0
4137

মোশারফ হোসেনঃ ঋণের বিপরীতে ব্যাংক যেসব জামানত গ্রহণ করে থাকে সেসবের মধ্যে ফিন্যান্সিয়াল অব্লিগ্যাশনের (ব্যাংকে জমা হিসেবে রক্ষিত অর্থ অথবা সহজেই নগদ অর্থে রুপান্তরিত করা যায় এমন আর্থিক সম্পদ) পরেই ব্যাংকারদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য জামানত হচ্ছে স্থাবর সম্পত্তি (জমি, বাড়ি, দালান-কোঠা, ফ্ল্যাট ইত্যাদি)। জামানতে ব্যাংকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য জামানতের ওপর চার্জ সৃষ্টি করতে হয়। স্থাবর সম্পত্তির ওপর ব্যাংকের অনুকূলে এই চার্জ সৃষ্টি হয় বন্ধকী দলিলের মাধ্যমে। আবার এই বন্ধকী দলিল সম্পাদনই ব্যাংকের অনুকূলে চার্জ নিশ্চিত করে না, যদিনা তা নির্ভুলভাবে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পাদিত এবং রেজিস্ট্রিকৃত হয়ে থাকে। বন্ধকী দলিলের পাশাপাশি বন্ধকদাতাকে ‘অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ দলিলও সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন করে দিতে হয়, যেখানে বন্ধকদাতা ঋণদাতা ব্যাংককে বন্ধকী সম্পত্তি অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ১২(৩) ধারা মতে বিক্রয়ের ক্ষমতা প্রদানসহ নির্দিষ্ট কিছু ক্ষমতার্পণের মাধ্যমে তাঁর (বন্ধকদাতার) পক্ষে মোক্তার বা অ্যাটর্নি নিয়োগ করে।

বন্ধকী জামানত গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধে অনিচ্ছুক বা অসমর্থ হলে বন্ধকী জামানত বিক্রি করে ঋণের টাকা আদায় করা। তাই ঋণ প্রদানের পূর্বে ব্যাংকারকে সঠিক ঋণগ্রহীতা যেমন বাছাই করে নিতে হয়, ঠিক তেমনি ঋণের বিপরীতে মূল্যবান, বিক্রয়যোগ্য/নগদায়নযোগ্য এবং বৈধ জামানত গ্রহণ করে ঋণের সেকেন্ড লাইন অব ডিফেন্স তথা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। আর এই নিরাপত্তা শুধু স্থাবর সম্পত্তির বাহ্যিক অবয়ব এবং আর্থিক মূল্য দিয়েই নিশ্চিত হয় না, যদিনা তার দলিল-দস্তাবেজ এবং আইনি ভিত্তি সঠিক হয়। আর বন্ধকী জামানতের এই শুদ্ধতা নিশ্চিত করাটা ব্যাংকারেরই দায়িত্ব।

ঋণের স্থাবর সম্পত্তিকে জামানত হিসেবে গ্রহণ করতে সবার আগে ব্যাংকারের করণীয় হচ্ছে, ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবীর কাছ থেকে মতামত (লিগ্যাল ভেটিং) গ্রহণ করা। মতামত গ্রহণ করার জন্য আইনজীবীর কাছে আলুথালু অসম্পূর্ণ ঋণ নথি প্রেরণ না করে ব্যাংকারকে যথাসম্ভব বন্ধকদাতার কাছ থেকে বন্ধকদাতার এনআইডি, টিআইএন; বন্ধকী সম্পত্তির মালিকানার ধারাবাহিকতা অনুসারে সকল দলিল-দস্তাবেজ আদায় করে মোটামুটি পরিপূর্ণ একটি ঋণনথি আইনজীবীর কাছে ফরোয়ার্ডিং লেটারসহ প্রেরণ করা উচিত। এতে করে মতামত প্রদানে আইনজীবীর অনাকাঙ্ক্ষিত কালক্ষেপণ কমে আসবে। তাই ব্যাংকারকে প্রাথমিকভাবে ঋণগ্রহীতা/বন্ধকদাতার কাছ থেকে বন্ধকী জমির সিএস, এসএ, আরএস খতিয়ান; বায়া দলিল, টাইটেল দলিল; বন্ধকদাতার নামে নামজারি খতিয়ান, ডিসিআর, হাল সন পর্যন্ত ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধের রশিদ; সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভার অধীনস্থ বন্ধকী ভূমিতে কোনো স্থাপনা থাকলে হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের রশিদ; মৌজা ম্যাপ, বন্ধকী সম্পত্তির অবস্থান রঙিন কালি বা হাইলাইটার দিয়ে চিহ্নিত করে কলমী/হাত নকশা; নির্দায়ী সনদ ইত্যাদি যথাসম্ভব আদায় করে তারপর আইনজীবীর কাছে পাঠানো উচিত। হাউজিং ঋণের ক্ষেত্রে নির্মিতব্য ভবনের অনুমোদিত প্ল্যান, ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের ক্ষেত্রে ডেভেলপার ও ভূমির মালিকের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কপিও সংগ্রহে থাকতে হবে। ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত জমির ক্ষেত্রে ওয়ারিশান সনদ গ্রহণ করতে হবে। নামজারিপূর্ব সর্বশেষ খতিয়ান যদি বন্দকদাতার নামেই লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে নামজারি ছাড়াও বন্ধক নেওয়া যাবে। পাওয়ার অব এ্যাটর্নি মূলে ক্ষমতাপ্রাপ্ত  ব্যক্তির পাওয়ার মূলে প্রাপ্ত সম্পত্তি বন্ধক নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সাব-রেজিস্ট্রার অস্বীকৃতি জানায়। তাদের বক্তব্য মতে, এক্ষেত্রে বন্ধকী দলিল করা গেলেও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল করা যায় না; কারণ চুক্তি আইন, ১৮৭২ এর ১৯০ ধারা মতে, “নো ডেলিগেটেড পাওয়ারস ক্যান বি ফার্দার ডেলিগেটেড”। অর্থাৎ একজন ডেলিগেট (এজেন্ট) কোনো তৃতীয় ব্যক্তির (সাব-এজেন্ট) কাছে তাঁর পাওয়ার ডেলিগেট করতে পারেন না। সহজ ভাষায়, পাওয়ার থেকে পাওয়ার দেওয়া যায় না। তাই কোনো সম্পত্তির পাওয়ার গ্রহীতা অন্য কাওকে (ব্যাংককে) একই সম্পত্তির বিষয়ে পাওয়ার অব এ্যাটর্নি দলিলের মাধ্যমে আরেকবার পাওয়ার প্রদান করতে পারেন না। তবে চুক্তি আইনের অন্য ধারায় উপযুক্ত ক্ষেত্রবিশেষে এজেন্ট কর্তৃক সাব-এজেন্ট নিয়োগের কথাও বলা আছে। কিন্তু যেহেতু অনেক সাব-রেজিস্ট্রার এবং আইনজীবীদের বিভক্ত মতামত দিতে দেখা যায়, তাই এসব জমি বন্ধক নিতে ব্যাংকারকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আবার দখলজনিত ঝুঁকির কারণে বণ্টননামা দলিল ব্যতীত যৌথ মালিকানাধীন কোনো সম্পত্তির আংশিক সম্পত্তি বন্ধক হিসাবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

বন্ধকদাতার এনআইডি, টিআইএন (পাঁচ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে ঋণের ক্ষেত্রে), টাইটেল দলিল, ডিসিআর, নামজারি খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) রশিদে বন্ধকদাতার নামের অভিন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির নাম ভিন্ন ভিন্ন  ডকুমেন্টে ভুল বা অসতর্কতাবশত ভিন্ন হতে দেখা যায়। অভিন্ন ব্যক্তির নামের এমন ভিন্নতা থাকলে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধির নিশ্চয়তা সনদ গ্রহণের পাশাপাশি প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট অথবা নোটারি পাবলিকের সম্মুখে নামের হলফনামা সম্পাদন করিয়ে নিতে হবে। ঋণ গ্রহীতা এবং জামিনদাতাদের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

মতামত প্রাপ্তির পর মতামতের সাথে জমিজমার দলিল-দস্তাবেজ ও অন্যান্য কাগজপত্র ট্যালি করে মিলিয়ে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, মতামতে সম্পত্তির মালিকানার ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হতে হবে। মতামতে উল্লিখিত তফসিলের সাথে দলিল-দস্তাবেজের তফসিল মিলিয়ে নিতে হবে। মতামত এবং দলিল-দস্তাবেজে তফসিল এবং অন্যান্য বিষয়ে কোনো ধরনের বিচ্যুতি বা ভিন্নতা পেলে তা সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর দৃষ্টিতে এনে মতামত সংশোধন করিয়ে নিতে হবে। মনে হতে পারে, এসব তো ব্যাংকের আইনজীবীর দায়িত্ব! কিন্তু না, আইনজীবীর পাশাপাশি ব্যাংকারেরও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কারণ, জামানতে ত্রুটির জন্য ঋণ অনাদায়ী হলে তার দায় যতটা না আইনজীবীর উপর বর্তাবে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি দায় নিতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারকেই।

চূড়ান্ত মতামত প্রাপ্তির পরপরই অনুমোদিত ইঞ্জিনিয়ার বা সার্ভেয়ার দিয়ে বন্ধকী সম্পত্তির ভ্যালুয়েশন করিয়ে নিতে হবে। ভ্যালুয়েশন রিপোর্ট পাওয়ার পর তা-ও ক্রস-চেক করে মতামতের সাথে তফসিল ও অন্যান্য বিষয়াদি মিলিয়ে নিতে হবে। পরবর্তীতে ঋণ প্রস্তাবেও মতামত অনুসারে তফসিল সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করে শাখার ভ্যালুয়েশন সার্টিফিকেট তৈরি করতে হবে। প্রধান কার্যালয়ের সিআরএম কর্তৃক ঋণ অনুমোদন করার পর ঋণ মঞ্জুরিপত্র (স্যাংকশন লেটার) শাখায় পৌঁছার পর শাখার দায়িত্ব হচ্ছে মঞ্জুরিপত্রে উল্লিখিত জামানতের তফসিল, ঋণের পরিমাণ, সুদের হার, মেয়াদ, পরিশোধ পদ্ধতিসহ অন্যান্য শর্তাদি ভালোভাবে চেক আউট করে নেওয়া। শাখার ভ্যালুয়েশন সার্টিফিকেটের সাথে মঞ্জুরিপত্রের তফসিলে কোনো বিচ্যুতি পেলে বা অন্যান্য কোনো বিষয়ে অসামঞ্জস্য প্রতীয়মান হলে তা তৎক্ষণাৎ প্রধান কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সিআরএমকে অবগত করে ঋণ মঞ্জুরিপত্র সংশোধন করিয়ে নিতে হবে।

এ পর্যায়ে ঋণ মঞ্জুরিপত্র ও মতামতের কপি, বন্ধকদাতা ও ঋণগ্রহীতার আইডি ও টিআইএন আইনজীবীর কাছে পাঠাতে হবে বন্ধকী ও অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব এ্যাটর্নি দলিল ও অন্যান্য অঙ্গীকারনামা (যদি থাকে) প্রস্তুত করার জন্য। বন্ধকী ও অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব এ্যাটর্নি দলিলের চূড়ান্ত কপি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে প্রিন্ট দেওয়ার পূর্বে খসড়া কপি নিয়ে যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে কোনো টাইপিং ভুল ও অন্যান্য কোনো ভুল-ভ্রান্তি আছে কিনা। ঋণ প্রস্তাব তৈরির ও পাশের আগে-পরে এই চেক এবং রিচেক নিশ্চিত করতে না পারলে দেখা যাবে ভুল তফসিলে ঋণ পাশ হয়ে যাবে অথবা  ভুল দাগ-খতিয়ান সম্বলিত ভুল তফসিলে বন্ধকী দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন হয়ে যাবে, যা পরবর্তীতে ব্যাংকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। এছাড়াও উভয় দলিলের শর্তাদি এবং ব্যাংকের ক্ষমতাসমুহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়ে দেখতে হবে। পাওয়ার অব এ্যাটর্নি দলিলে অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ১২(৩) ধারা মতে আদালতের হস্তক্ষেপ ব্যতীত বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষমতা ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে।

দলিল রেজিস্ট্রি করা হয় রেজিস্ট্রেশন আইন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, স্ট্যাম্প আইন, আয়কর আইন, অর্থ আইন ও রাজস্বসংক্রান্ত বিধি এবং পরিপত্রের আলোকে। তাই দলিল তৈরি, সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশনের সকল স্তরে সতর্কতার সাথে আইনের পরিপালন নিশ্চিত না করলে, রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে দেখা যাবে সাব-রেজিস্ট্রার দলিলে এমন কোনো ভুল খুঁজে বের করলেন যার জন্য রেজিস্ট্রেশন করতে অস্বীকৃতি জানালেন, আর অন্যদিকে ঋণগ্রহীতা ঋণের অর্থ ছাড় করাতে একাট্টা হয়ে ওঠেছে। অথবা দেখা যাবে ভুল তথ্যাদি দিয়েই দলিল রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেল, যা ক্রেডিট এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের দৃষ্টিতে আসায় ডিসবার্সমেন্ট আটকে দিয়েছে, অথবা ভবিষ্যতে এই ঋণ খেলাপি হলে  আইনি প্রতিকার বাধাগ্রস্ত হবে। যেমন ধরুন, একজন বন্ধকদাতার ২০ শতাংশ বন্ধকী জমির ১৫ শতাংশ কিশোরগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অধীন আর বাকি ৫ শতাংশ গাজীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অধীন। তাহলে ২০ শতাংশ জমির বন্ধকী দলিলটি কোন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে? কিশোরগঞ্জ নাকি গাজীপুর? এসব ক্ষেত্রে যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অধীনস্থ জমির পরিমাণ বেশি সেই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেই বন্ধকী দলিলটি রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। অর্থাৎ উপরিউক্ত ক্ষেত্রে বন্ধকী দলিলটি কিশোরগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এই ব্যতিক্রমী সতর্কতাটুকু আইনজীবীর পাশাপাশি ব্যাংকারকেও নিশ্চিত করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, বন্ধককৃত জমির বন্ধকী দলিল রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বন্ধকী দলিলের আইনগত মূল্য নেই। বন্ধকী দলিল ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট-১৮৮২ এর ৫৯ ধারা অনুসারে সম্পন্ন করতে হবে। আর এই রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সরকারি খরচাদি সম্পর্কে ঋণগ্রহীতা এবং বন্ধকদাতাকে স্পষ্ট হিসাব দিতে ব্যাংকারকে বন্ধকী সংক্রান্ত স্ট্যাম্প শুল্ক, রেজিস্ট্রেশন ফি ও অন্যান্য ফি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতে হবে। কারণ ঋণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য ঋণগ্রহীতার প্রত্যেকটি খরচের খাত ও পরিমাণ সম্পর্কে ব্যাংকারকে জানতে হবে এবং ঋণ সংক্রান্ত খরচ কিংবা কর্তনের বিষয়ে গ্রাহকের প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জ্ঞান এবং প্রস্তুতি অবশ্যই ব্যাংকারের থাকতে হবে। আইনজীবীর খরচ ছাড়াও দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় গ্রাহককে সরকারি শুল্ক এবং ফি বাবদ আরও কিছু খরচ গুণতে হয়। তবে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে রেজিস্ট্রেশন বাবদ  আদায়কৃত ফিসের রশিদ প্রদান করা হলেও ব্যাংকার এবং গ্রাহক অনেকের কাছেই খরচের বিভিন্ন খাত এবং পরিমাণ স্পষ্ট নয়। রশিদ ছাড়াও দলিলের প্রথম পাতায় এবং পিছনের পৃষ্ঠায় রেজিস্ট্রেশন এবং অন্যান্য ফি সংক্রান্ত বিভিন্ন খরচাদির উল্লেখ থাকে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অস্পষ্ট সীল এবং পাঠ-অযোগ্য হাতের লেখার কারণে সাধারণ মানুষ খাতওয়ারি এসব খরচ সম্পর্কে স্পষ্ট করে জানতে পারে না। ফলে অসহায় হয়ে দলিল লেখক বা মধ্যস্থতাকারী দালালদের চাহিদামত সরকার নির্ধারিত ফি’র কয়েকগুণ বেশি ফি এবং খরচ প্রদান করে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। এই নিবন্ধ লেখা শুরু করার আগে রেজিস্ট্রেশন এবং নকল উত্তোলনের খরচের অনেক খাত নিয়ে আমার নিজেরও অস্পষ্টতা ছিল। তবে নিজের জ্ঞানপিপাসা মিটাতে রেজিস্ট্রেশন বিষয়ক বিভিন্ন আইন, ম্যানুয়াল ও পরিপত্র স্টাডি করে এবং আইনজীবী ও রেজিস্ট্রেশন পেশায় নিয়োজিত বিভিন্ন পেশাজীবিদের কাছ থেকে বন্ধকী সংক্রান্ত খরচাদি বিষয়ে লব্ধ জ্ঞান ব্যাংক গ্রাহকদের স্বার্থে এবং আমার ব্যাংকার সহকর্মীদের জ্ঞাতার্থে নিম্নে তুলে ধরছি।

বন্ধকী দলিলের স্ট্যাম্প শুল্কঃ ১৮৯৯ সালের স্ট্যাম্প আইনের ১ নম্বর তফসিলের ৪০ (২) নম্বর ক্রমিকে উল্লিখিত বর্ণনা অনুসারে-
(ক) ঋণের পরিমান ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হলে- ২০০০ টাকা,
(খ) ঋণের পরিমান ২০ লক্ষ টাকার অধিক কিন্তু ১ কোটি টাকার অধিক না হলে- ৫০০০ টাকা,
(গ) ঋণের পরিমান ১ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে হলে- প্রথম ১ কোটি টাকার জন্য ৫০০০ টাকা এবং অবশিষ্ট ঋণের জন্য ০.১০% হারে স্ট্যাম্প শুল্ক প্রযোজ্য হবে।

স্ট্যাম্প শুল্ক তিনভাবে পরিশোধ করা যায়।
এক. নগদে (অনধিক ৩০০ টাকা পর্যন্ত)
দুই. দলিলে ব্যবহৃত নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মাধ্যমে (অনধিক ১২০০ টাকা পর্যন্ত)
তিন. পে-অর্ডার বা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে। তবে মনে রাখতে হবে, দলিলে একশত টাকা বা তদনিম্ন মূল্যমানের যেকোনো সংখ্যক নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প সিট ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক কার্টিজ পেপার ব্যবহার করা যাবে, তবে ১০০ টাকার বেশি মূল্যমানের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প সিট ব্যবহার করা যাবে না এবং সর্বোচ্চ ১২০০ টাকা পর্যন্ত স্ট্যাম্প শুল্ক নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মাধ্যমে পরিশোধ করা যাবে। নগদে বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধের ক্ষেত্রে বন্ধকী দলিলে ব্যবহৃত নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মূল্য মোট স্ট্যাম্প শুল্ক থেকে বাদ দিয়ে স্ট্যাম্প খাতের বাকি অর্থ নগদে (অনধিক ৩০০ টাকা) বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক লিমিটেডে (নিবন্ধন ম্যানুয়াল ২০১৪ তে দলিল সম্পাদিতব্য এলাকার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের কথা বলা থাকলেও বর্তমানে ভূমি রেজিস্ট্রেশন বিষয়ক সরকারি এসব শুল্ক এবং ফি’র ব্যাংক হিসাব সাধারণত সোনালী ব্যাংকই মেইনটেইন করে) কোড নং ১১৬২১০২ তে (পুরাতন কোড নং ১.১১০১.০০২০.১৩১১) জমা করতে হবে।

বন্ধকী দলিলের রেজিস্ট্রেশন ফি (“এ ফি”): রেজিস্ট্রেশন আইন-১৯০৮, এর ধারা ৭৮এ (সি) অনুসারে-
(ক) ঋণ বাবদ মঞ্জুরিকৃত অর্থের পরিমান ৫ লক্ষ টাকার ঊর্ধ্বে না হলে: ঋণ বাবদ মঞ্জুরিকৃত টাকার ১%, কিন্তু ২০০ টাকার কম নয় এবং ৫০০ টাকার বেশি নয়।
(খ) ঋণ বাবদ মঞ্জুরিকৃত অর্থের পরিমান ৫ লক্ষ টাকার ঊর্ধ্বে কিন্তু ২০ লক্ষ টাকার ঊর্ধ্বে না হলে: ঋণ বাবদ মঞ্জুরিকৃত টাকার ০.২৫%, কিন্তু ১৫০০ টাকার কম নয় এবং ২০০০ টাকার বেশি নয়।
(গ) ঋণ বাবদ মঞ্জুরিকৃত অর্থের পরিমান ২০ লক্ষ টাকার ঊর্ধ্বে হলে: ঋণ বাবদ মঞ্জুরিকৃত টাকার ০.১০%, কিন্তু ৩০০০ টাকার কম নয় এবং ৫০০০ টাকার বেশি নয়। রেজিস্ট্রেশন ফি পে-অর্ডারের মাধ্যমে কোড নং ১৪২২২০১ তে জমা করতে হবে (পুরাতন কোড ১.২১৬১.০০০১.১৮২৬)।

বন্ধকী দলিলের অন্যান্য ফিঃ স্ট্যাম্প শুল্ক এবং রেজিস্ট্রেশন ফি (“এ ফি”) ছাড়াও
এক. ২০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে প্রিন্টকৃত হলফনামা দলিলের সাথে সংযুক্ত করতে হবে
দুই. “ই ফি” ১০০ টাকা
তিন. বালাম বইয়ে (রেজিস্ট্রেশন বই) হাতে-কলমে নকলকরণ বাবদ “নকল ফি” (এন ফি) প্রযোজ্য হবে। “এন ফি”র হার হবে প্রতি পৃষ্ঠা (৩০০ শব্দ বিশিষ্ট) বা উহার অংশবিশেষের জন্য বাংলার ক্ষেত্রে ১৬/- টাকা ও ইংরেজির ক্ষেত্রে ২৪/- টাকা। উল্লেখ্য, বালাম বইয়ের (রেজিস্ট্রেশন বই) প্রতি পৃষ্ঠা ৩০০ শব্দসমতুল্য (প্রতি পৃষ্ঠায় ৩০০ শব্দের জন্য ৩০০টি ঘর থাকে)। দলিল দাখিল করার পর দলিলটি নকলকরণার্থে বালাম বইয়ের কত পৃষ্ঠা লাগতে পারে তা অনুমান করা হয় এবং বালাম বইয়ের এই অনুমানকৃত পৃষ্ঠা সংখ্যার উপর এই ফি নির্ধারণ করা হয়। কোনো কোনো  সাব-রেজিস্ট্রি অফিস দলিল নির্বিশেষে মিনিমাম অংকের থোক (লাম্পসাম) ‘এন ফি’ আদায় করে থাকে, যেমন যেকোনো দলিলের জন্য কমপক্ষে ১০ পাতার সমতূল্য ‘এন ফি’ আদায় করে। দলিলভেদে তা আরও বাড়তে পারে। পরবর্তীতে দলিলটি বালামে নকল করার পর তা নকলকরণার্থে সংশ্লিষ্ট বালাম বইয়ের কতটি পৃষ্ঠা লেগেছে তা ওই দলিলের পিছনে উল্লেখ করা হয় এবং যদি দেখা যায় রেজিস্ট্রেশনের সময় আদায়কৃত “এন ফি” বালাম বইয়ের দখলকৃত পৃষ্ঠা সংখ্যার চাইতে কম পৃষ্ঠার জন্য আদায় করা হয়েছে, তাহলে মূল দলিল গ্রহণের সময় অনাদায়ী পাতার ফি আদায় করে তারপর মূল দলিল প্রদান  করা হয়
চার. বালাম বইয়ে নকলকরণ বাবদ “নকলনবিশদের পারিশ্রমিক” (“এনএন ফি”) প্রতি পৃষ্ঠা (৩০০ শব্দ বিশিষ্ট) বা উহার অংশবিশেষের জন্য বাংলার ক্ষেত্রে ২৪/- টাকা ও ইংরেজির ক্ষেত্রে ৩৬/- টাকা হারে প্রযোজ্য হবে। “ই ফি” এবং “এন ফি” রেজিস্ট্রেশন ফি (“এ ফি”) এর সাথে একত্রে পে-অর্ডারের মাধ্যমে কোড নং ১৪২২২০১ তে (পুরাতন কোড ১.২১৬১.০০০১.১৮২৬) জমা করতে হবে। “এনএন ফি” নগদে জমা দিতে হবে।

অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলের স্ট্যাম্পশূল্কঃ ১৮৯৯ সালের স্ট্যাম্প আইনের ১ নম্বর তফসিলের ৪৮(সি) নম্বর ক্রমিকে উল্লিখিত বর্ণনা অনুসারে ব্যাংকের বরাবরে প্রদত্ত অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলে ১০০০ টাকার স্ট্যাম্প শুল্ক প্রযোজ্য। বন্ধকী দলিলের মত একই পদ্ধতিতে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলের স্ট্যাম্প শুল্কও পরিশোধ করা যাবে। দলিলে এক হাজার টাকার কম নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ব্যবহার করলে বন্ধকী দলিলের মতই অবশিষ্ট অংকের স্ট্যাম্প শুল্ক পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।

অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলের রেজিস্ট্রেশন ফিঃ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ এর অধীন সম্পাদিত অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ফি রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ৭৮ অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। এ দলিলের রেজিস্ট্রেশন ফি (“ই ফি”) ১০০ টাকা।

অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলের অন্যান্য ফিঃ বন্ধকী দলিলের মত এ দলিলের ক্ষেত্রেও ২০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্টাম্পে প্রিন্টকৃত হলফনামা, “ই ফি” ১০০ টাকা, এবং একই হারে “এন ফি” এবং “এনএন ফি” লাগবে। তবে সকল ফি রেজিস্ট্রি অফিসে নগদে পরিশোধ করতে হবে।

পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ এর অধীন সম্পাদিত অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নির রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক এবং রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ এর ৫২এ তে বিধৃত নিম্নোক্ত  বিবরণ প্রযোজ্য হবেঃ
এক. বন্ধকদাতা যদি ওয়ারিশ সূত্রে মালিক না হয়ে ক্রয় বা অন্যান্য সূত্রে মালিক হয়ে থাকেন, তাহলে “রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০” এর অধীন বন্ধকদাতার নিজ নামে প্রস্তুতকৃত সর্বশেষ খতিয়ান
দুই. বন্ধকদাতা ওয়ারিশ সূত্রে মালিক হয়ে থাকলে তাঁর  নিজ নামে অথবা পূর্বসূরির নামে প্রস্তুতকৃত সর্বশেষ খতিয়ান
তিন. সম্পত্তির প্রকৃতি
চার. সম্পত্তির মূল্য
পাঁচ. সীমানা ও চারদিকের চৌহদ্দিসহ সম্পত্তির হাত নকশা
ছয়. বিগত ২৫ বছরের মালিকানার ধারাবাহিক সংক্ষিপ্ত বিবরণ
সাত. তফসিল বর্ণিত বন্ধকী সম্পত্তি ইতোপূর্বে বন্ধকদাতা অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করেনি এবং বন্ধকী সম্পত্তিতে বন্ধকদাতার আইনগত স্বত্ব বহাল রয়েছে মর্মে বন্ধকদাতার কাছ থেকে হলফনামা

এছাড়াও অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি রেজিস্ট্রেশনের সময় বন্ধকদাতার নামে প্রকাশিত সর্বশেষ খতিয়ান/নামজারি খতিয়ানের সাথে ডিসিআর ও হাল সন পর্যন্ত ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধের রশিদ, বন্ধকদাতার জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্ম নিবন্ধন সনদ/পাসপোর্ট, টিআইএন (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) এর ফটোকপি, পাসপোর্ট আকারের রঙিন ছবি, ঋণ মঞ্জুরিপত্রের কপিও সংযুক্ত করতে হবে। তাছাড়া দলিলে পাওয়ার গ্রহীতা ব্যাংকের সম্মতি স্বাক্ষরও লাগবে।

রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, দলিল সম্পাদন এবং রেজিস্ট্রেশনের  তারিখ স্ট্যাম্প ক্রয়ের আগের কোনো তারিখ হওয়া সম্ভব নয় (ভেন্ডররা স্ট্যাম্প বিক্রয়ের সময় স্ট্যাম্পের পিছনে সংশ্লিষ্ট দিনের যে তারিখ উল্লেখ করে থাকে তা-ই স্ট্যাম্প ক্রয়ের তারিখ)। আবার যেকোনো দলিল রেজিস্ট্রেশন করার আগেই নির্ধারিত স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধিত হতে হয়। তাই রেজিস্ট্রেশনের আগেই স্ট্যাম্প শুল্ক বাবদ পে-অর্ডার প্রস্তুত রাখতে হবে, অর্থাৎ পে-অর্ডারের তারিখ দলিল রেজিস্ট্রেশনের দিনের বা আগের তারিখের হতে হবে।

আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, একাধিক ঋণ মঞ্জুরিপত্রের মাধ্যমে ঋণ মঞ্জুরির ক্ষেত্রে সরকারি রাজস্ব আয় বাড়াতে অনেক সাব-রেজিস্ট্রারকে আলাদা আলাদা ঋণ মঞ্জুরিপত্রে উল্লিখিত ঋণ সীমা বিবেচনায় স্ট্যাম্প শুল্ক ও রেজিস্ট্রেশন ফি আদায় করতেও দেখা যায়। তবে এক্ষেত্রে ই ফি, এন ফি, এনএন ফি একবারই আদায়যোগ্য ।

রিডেম্পশন ও রিভোকেশনঃ ঋণ পরিশোধ শেষে বন্ধকদাতার বন্ধককৃত জমি রিডেম্পশন/রিকনভেন্স দলিলের (দায়মুক্তি দলিল বা পুনঃহস্তান্তরকরণ দলিল) মাধ্যমে দায়মুক্ত করে দিতে হয়। এ দলিলটি ব্যাংকার সম্পাদন করবে। এজন্য ব্যবস্থাপক নিজে দলিলটি সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন করবেন অথবা কোন কর্মকর্তাকে অথারাইজড করে সাব রেজিস্ট্রার বরাবরে চিঠি লিখবে। একইভাবে ব্যাংকের দেনা পরিশোধ শেষে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দাতাও (ব্যাংকারের সম্মতি স্বাক্ষর সাপেক্ষে) রিভোকেশন দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে ব্যাংককে দেওয়া তাঁর পাওয়ার প্রত্যাহার/রদ করে নিবে। রিডেম্পশন  দলিলে স্ট্যাম্প শুল্ক ৩০০ টাকা, রেজিস্ট্রেশন ফি (ই ফি) ১০০ টাকা, ই ফি ১০০ টাকা, এন ফি, এনএন ফি এবং ২০০ টাকার স্ট্যাম্পে হলফনামা লাগবে। একইভাবে রিভোকেশন (রহিতকরণ) দলিলে স্ট্যাম্প শুল্ক ২০০ টাকা, রেজিস্ট্রেশন ফি (ই ফি) ১০০ টাকা, ই ফি ১০০ টাকা, এন ফি, এনএন ফি এবং ২০০ টাকার স্ট্যাম্পে হলফনামা লাগবে। চলতি ঋণের ক্ষেত্রে ঋণ সীমা বাড়ার ফলে নতুন করে বন্ধকী এবং পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল রেজিস্ট্রেশনের আগে পূর্বের বন্ধকী এবং পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল যথাক্রমে রিডেম্পশন এবং রিভোকেশন করে নিতে হবে।

দলিলের নকল উত্তোলন এবং এর ফিসমুহঃ রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পাদনের পরক্ষণেই দলিলের সত্যায়িত নকল (অনুলিপি) উত্তোলন করে ঋণ নথিতে সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো দলিলের নকল প্রস্তুতকরণ বা প্রদানের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ফি প্রদান করতে হবেঃ
এক. সূচী বহিতে তল্লাশি ফি (এফ-১ ফি) এক বছরের জন্য ২০ টাকা, একাধিক বছর হলে প্রথম বছর ২০ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি বছর ১৫ টাকা করে (রেজিস্ট্রেশন করার সময় নকল প্রাপ্তির আবেদন করলে তল্লাশি ফি দিতে হবে না)
দুই. রেজিস্ট্রেশন বা বালাম বহি পরিদর্শন ফি (এফ-২ ফি) প্রতি দলিলের নকলের জন্য ১০ টাকা
তিন. নকল বাবদ ফি (জিএ ফি) প্রতি পৃষ্ঠা (৩০০ শব্দ বিশিষ্ট) বা উহার অংশবিশেষের জন্য বাংলার ক্ষেত্রে ১৬/- টাকা ও ইংরেজির ক্ষেত্রে ২৪/- টাকা।
চার. প্রার্থীত নকলের জন্য অগ্রাধিকার চাইলে অতিরিক্ত ৫০/- টাকা ফি দিতে হবে, এবং প্রার্থীত জরুরি নকলটি যদি প্রতি পৃষ্ঠায় ৩০০ শব্দবিশিষ্ট চার পৃষ্ঠার অধিক হয় তাহলে চারের অতিরিক্ত প্রতি পৃষ্ঠার জন্য আরও ১৫/- টাকা হারে অতিরিক্ত ফি (জিবি ফি) দিতে হবে
পাঁচ. জিএ ফি ছাড়াও নকলনবিশগণের পারিশ্রমিক বাবদ  অতিরিক্ত জিজি ফি প্রতি ৩০০ শব্দবিশিষ্ট ১ পৃষ্ঠা বা উহার অংশবিশেষের জন্য বাংলার ক্ষেত্রে ২৪/- টাকা ও ইংরেজির ক্ষেত্রে ৩৬/- টাকা প্রযোজ্য।
ছয়. ফিস প্রধান হতে রেহাই প্রাপ্ত নকল ব্যতীত অন্যান্য সকল নকলের আবেদনে কোর্ট ফি আইন, ১৮৭০ এর অধীন ২০ টাকার কোর্ট ফি প্রদেয় হবে।
সাত. এছাড়াও নকলের ক্ষেত্রে ৫০/- টাকা স্ট্যাম্প শুল্ক প্রযোজ্য।

যদি কোন আবেদনকারী ইতোমধ্যে নিবন্ধিত কোন দলিলের মুদ্রিত বা টাইপকৃত নকল দাখিল করে তাকে ‘অবিকল নকল’ মর্মে প্রত্যয়নযুক্তরূপে পাবার জন্য আবেদন করেন, তা হলে এরূপ নকলের তুলনা করার জন্য ফিস ও পারিশ্রমিকের পরিমাণ দফা ‘জিএ’, ‘জিবি’ এবং ‘জিজি’ অনুসারে ধার্যযোগ্য ফিস ও পারিশ্রমিকের অর্ধেক হবে। তবে বাস্তবে অনেক সাব রেজিস্ট্রি অফিস মিনিমাম একটা পৃষ্ঠা সংখ্যা, যেমন বালামে ওঠার আগেই টাইপকৃত নকলের জন্য ৬ পৃষ্ঠা এবং হাতে লেখা নকলের জন্য ১১ পৃষ্ঠা ধরে ফি আদায় করে; আর বালামে ওঠার পর নকল নিতে চাইলে বালামের পৃষ্ঠা (দলিলটি বালামের যত পৃষ্টা জুড়ে বিস্তৃত) হিসাব করে ফি নেয়া হয়। এসব ফি নগদে রেজিস্ট্রি অফিসে জমা করতে হবে।

উপরিউল্লিখিত ফিসমুহ প্রায় সব ব্যাংকার এবং গ্রাহকের কাছে অজানা বা অস্পষ্ট। আবার এসব ফি ছাড়াও দলিল প্রস্তুতকারকের (দলিল লেখক বা আইনজীবী) ফি এবং সরকার অননুমোদিত অদৃশ্য কিছু ফি দলিল দাতা/গ্রহীতাদের প্রদান করতে হয়। যেমন- দালাল (রেজিস্ট্রেশন মধ্যস্থতাকারী)  ফি, দলিল লেখক সমিতির চাঁদা ইত্যাদি। ব্যাংকাররা যেহেতু ব্যাংকের এসব দলিল তাদের আইনজীবীদের মাধ্যমে প্রস্তুত করে থাকে, তাই বন্ধকী এবং পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল রেজিস্ট্রেশন করতে ব্যাংকারদের কোনো দলিল লেখক বা দালালদের দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন হওয়ার কথা না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, অনেক সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দালাল এবং দলিল লেখক সমিতিকে ডিঙিয়ে কোনো রেজিস্ট্রেশন সম্পাদন করা যায় না। আর অন্যদিকে দলিল প্রস্তুত করতেই কেবল আইনজীবীদের পাওয়া যায়, কিন্তু বাস্তবে রেজিস্ট্রেশন কার্যটি সম্পাদন করতে হয় ব্যাংকারকেই। ফলে ব্যাংকারের অজ্ঞতা এবং রেজিস্ট্রি অফিসের সিন্ডিকেটের কারণে সরকারি প্রকৃত খরচের কয়েকগুণ বেশি খরচ গুণতে হয় ঋণ গ্রহীতা বা বন্ধকদাতাকে, যা ঋণ গ্রহীতার ঋণের প্রাইসিং বাড়িয়ে দেয় ও ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি করে এবং সর্বোপরি ব্যাংকের বিনিয়োগ সম্প্রসারণের অন্যতম বাধা হিসাবে কাজ করে।                                  

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূল দলিল সংগ্রহ করাঃ রেজিস্ট্রেশনের সাথে সাথে রেজিস্ট্রেশন রশিদ গ্রহণ করে তা বন্ধকদাতা দলিলদাতা কর্তৃক ডিসচার্জ করিয়ে দলিলের সার্টিফাইড কপিসহ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ঋণ নথিতে রেখে দিতে হবে। দলিল নম্বরগুলোর তারিখভিত্তিক রেজিস্টার সংরক্ষণ করে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে সময়মত মূল দলিল সংগ্রহ  করে নিতে হবে। কারণ, রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ এর ধারা ৮৫ মতে উইল ব্যতীত যেকোনো দলিল ২ বছরের অধিক সময় অদাবিকৃত থাকলে তা ধ্বংস করে ফেলার বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসভেদে মূল দলিল ডেলিভারি দিতে ২ থেকে ৫ বছরের মত সময় লেগে যায়। 

(সূত্রঃ দৈনিক শেয়ার বিজ, তারিখ- ২৪ ও  ২৫  জানুুয়ারি, ২০১৯) 

লেখকঃ ব্যাংকার
ইমেইল: [email protected]

 

Leave a Reply