ব্যাংকারদের করণীয় এবং বাস্তবতা

1
8266

মোশারফ হোসেন: ব্যাংকাররা মানুষ, কিন্তু ব্যতিক্রমী মানুষ। আর ব্যতিক্রমী বলেই কর্মক্ষেত্রে তাদের হতে হয় অনেকটাই যান্ত্রিক ‘রোবট’ কিংবা অতি মানবীয় নিষ্পাপ ‘ফেরেশতা’। কারণ ব্যাংকারদের ভুল করার সুযোগ নেই। একটু ভুল মানেই কোটি কোটি টাকার ঝুঁকিতে পড়ে যাওয়া। যেমন ১০ লাখ টাকা পোস্টিং দিতে গিয়ে ভুলে একটি ‘০ (শূন্য)’ বেশি দিলে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকার তথা ব্যাংককে ৯০ লাখ টাকার ঝুঁকিতে পড়ে যেতে হয়। কাজের যত চাপ, আর গ্রাহকের যত ভিড়ই থাকুক না কেন, ব্যাংকারকে কোনো ভুল করাই যাবে না! তবুও ভুল হচ্ছে, অনিয়ম হচ্ছে। কিন্তু কেন হচ্ছে? প্রথম কারণ হচ্ছে, ব্যাংকাররাও মানুষ আর ভুল করাই মানুষের স্বভাব। ভুল তারই হয় না, যে কিছুই করে না। তথাপি ব্যাংকারদের পেশাগত দায়িত্বভুক্ত সব কাজই করতে হবে নির্ভুলভাবে এবং নিয়মসিদ্ধভাবে। এখানে ভুলের বা অনিয়মের কোনো ক্ষমা নেই। ব্যাংকারদের নিয়োগকর্তারাও জানেন যে, ব্যাংকাররা রোবট, দেবতা বা ফেরেশতা নন। তবুও তারা রক্ত-মাংসে গড়া মানবীয় গুণাবলিসম্পন্ন ব্যাংকারদের নিয়োগ দেন। আবার ব্যাংকাররাও জানেন, ব্যাংকিং পেশায় কোনো ভুল বা অনিয়ম করা যাবে না। কিন্তু তবুও কেন ব্যাংকাররা ভুল বা অনিয়ম করছেন? একজন ব্যাংকার হিসেবে আমি কিছু উত্তর খুঁঁজতে চেয়েছি।

এক. প্রতি বছর ব্যাংকগুলোর প্রফিট টার্গেট (মুনাফা লক্ষ্যমাত্রা) নির্ধারণ করা হয় বিগত বছরের অর্জিত প্রফিটের (মুনাফা) কয়েক গুণ। শাখা পর্যায়ে এ লক্ষ্যমাত্রা দুই থেকে তিন গুণ বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি হয়ে থাকে। অর্থাৎ মুনাফা লক্ষ্যমাত্রার প্রবৃদ্ধি ক্ষেত্রবিশেষে সর্বোচ্চ প্রায় ২০০ শতাংশেরও বেশি হয়! দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যেখানে ছয়-সাত শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেখানে ১০০ শতাংশ বা ২০০ শতাংশ বা ততধিক প্রবৃদ্ধির প্রফিট টার্গেট (মুনাফা লক্ষ্যমাত্রা) স্থির করা বেপরোয়া ব্যাংকিং এরই নামান্তর। ব্যাংকগুলোর কমিশন খাতের আয়ের চেয়ে ঋণের সুদ খাতের আয়ের পরিমাণই বেশি। কিন্তু আসছে বছরের মুনাফা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে, আসছে বছরে ঋণের সুদের হার বিগত বছরের ঋণের সুদের হারের চাইতে যে অনেকটা কমেও যেতে পারে এ বিষয়টা একেবারেই বিবেচনায় আনা হয় না। যেমন ২০১৫ সালে অধিকাংশ ব্যাংকে ঋণের সুদের হার ছিল ১৮ শতাংশ; ২০১৬ সালের শুরুর দিকে তা ছিল ১৫ শতাংশ, যা ২০১৬ সালের শেষের দিকে কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১৩ শতাংশে। ২০১৭ সালে সুদহার ১৩ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও কিছু কিছু গ্রাহকের ক্ষেত্রে তা ১০.০০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছিল। ইতোমধ্যে ঋণের সুদের হার এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনার জন্য ব্যবসায়িক মহল থেকে জোর দাবিও জানানো হচ্ছে। সর্বশেষ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু ২০১৬ সালের মুনাফা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার সময় অধিকাংশ ব্যাংকই ১৮ শতাংশ সুদের হারে অর্জিত ২০১৫ সালের মুনাফার ওপর ভিত্তি করেই ২০১৬ সালের মুনাফা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এবং ১৫ শতাংশ সুদের হারে অর্জিত ২০১৬ সালের মুনাফার ওপর ভিত্তি করেই ২০১৭ সালের মুনাফা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। ২০১৮ সালের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণেও এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এর ফলে বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রা এবং অর্জনের মধ্যে বিস্তর ফারাক প্রতীয়মান হয়। তাছাড়া ব্যাংকের নির্দেশনা মতে, প্রতিটি শাখা তাদের নিজেদের জন্য যে ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে, ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুমোদন করে না, বরং শাখার সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনা না করে শাখার জন্য নিশ্চিত অসম্ভব একটি লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে শাখার ওপর চাপিয়ে দেয়। ফলে অসম্ভব মুনাফা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের তাগিদে এক ব্যাংক আরেক ব্যাংকের গ্রাহক নিয়ে টানাটানি করে এবং ১০০ টাকার সিকিউরিটির (সহায়ক জামানত) বিপরীতে প্রথম ব্যাংক যেখানে ৫০ টাকা বা ৬০ টাকা ঋণ দিয়েছে, দ্বিতীয় আরেকটি ব্যাংক সেই একই সিকিউরিটির বিপরীতে ১০০ টাকা বা ১২০ টাকা ঋণ দিয়ে দিচ্ছে এবং ১০০ টাকার সেই সিকিউরিটির মূল্য দেখাচ্ছে ২০০ টাকা বা ২৪০ টাকা। অর্থাৎ দ্বিতীয় ব্যাংক জামানতের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে ঋণের সীমা নির্ধারণ করছে না, বরং প্রস্তাবিত বা পরিকল্পিত ঋণ-সীমার ওপর ভিত্তি করে জামানতের মূল্য নির্ধারণ করছে (অতিমূল্যায়ন করছে)। তাছাড়া ব্যাংকের নতুন শাখা খোলার পর অতি দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য স্থানীয় পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের অযৌক্তিক বর্ধিত ঋণ সীমা এবং আমানতের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুদ প্রস্তাব করে। ব্যাংকের নতুন শাখা, পুরোনো অন্য কোনো ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণগ্রহীতার ঋণও টেক-ওভার করতে দেখা যায়, যা সুষ্ঠু ব্যাংকিংয়ের পরিবেশ নষ্ট করে। প্রয়োজনাতিরিক্ত কিংবা অযাচিত ঋণ মঞ্জুরির কারণে এসব ঋণগ্রহীতার কাছে প্রয়োজনাতিরিক্ত অর্থ চলে আসে, ফলে ঋণগ্রহীতা ফান্ড ডাইভার্সনের সুযোগ নিয়ে অন্যত্র বিনিয়োগ করে। ঋণ দেওয়া হয়েছে হয়তো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য চালের ব্যবসার জন্য কিন্তু বিনিয়োগ করা হচ্ছে জমি, ফ্ল্যাট বা বিলাস দ্রব্য কেনার কাজে! ফলে মূল যে ব্যবসার জন্য ঋণ দেওয়া হয়েছিল তা ধীরে ধীরে অসুস্থ হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে মন্দঋণে পরিণত হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক ব্যাংকে ঋণ থাকা সত্ত্বেও অন্য ব্যাংক একই ব্যবসার জন্য আবারও ঋণ দিয়ে দিচ্ছে, ফলে একপর্যায়ে দুটি ঋণই মন্দ ঋণে পরিণত হয়। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান তারল্য সংকটের পেছনে আগ্রাসী এই বিনিয়োগ প্রতিযোগীতাই সবচেয়ে বেশি দায়ী।

দুই. বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে, তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে কয়েন (ধাতব মুদ্রা) ও কম মূল্যমানের নোট (১, ২, ৫, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোট) নিতে চায় না। সবার জানা উচিত, প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংক শাখার নগদ অর্থ সংরক্ষণের জন্য সিন্দুক সীমা (ভল্ট লিমিট) নির্ধারিত থাকে এবং এই সিন্দুক সীমার অতিরিক্ত অর্থ সংরক্ষণ একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কারণ সিন্দুক সীমার অতিরিক্ত অর্থের জন্য কোনো বিমা কাভারেজ পাওয়া যায় না। এ জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংককে তাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে গ্রহণ করা সীমাতিরিক্ত ধাতব মুদ্রা বা কাগজি নোট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে, আর যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা নেই সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি ব্যাংকে জমা দিতে হয়। কিন্তু প্রতিনিধি ব্যাংকের অনেক ক্যাশ কর্মকর্তারাই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে রেমিট্যান্স গ্রহণকালে ছোট নোট নিতে চায় না, কয়েন তো চিন্তাও করা যায় না; সপ্তাহে দুদিনের বেশি রেমিট্যান্স নিতে চায় না; প্রতি রেমিট্যান্সে নির্ধারিত সংখ্যক নোটের বেশি নিতে চায় না। অন্যদিকে অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংকের ফিডিং শাখাও অধীনস্থ শাখাগুলো থেকে ছোট নোটের (১, ২, ৫, ১০, ২০ ও ৫০) রেমিট্যান্স গ্রহণে গড়িমসি করে। ধাতব মুদ্রা নেওয়ার কোনো নজির আছে কিনা, জানা নেই। আবার গ্রাহকদের ছোট নোট দিতে চাইলে তো গুলি খাওয়ার মতো অবস্থা হয় ব্যাংকারদের, কয়েন দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না! তাহলে শাখা পর্যায়ের ব্যাংকারদের কী করার আছে? একাধিক পত্রিকায় বারবার লেখালেখির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রজ্ঞাপন জারি করে তফসিলি সব ব্যাংক শাখাকে ধাতব মুদ্রার প্রত্যেকটির কমপক্ষে ১০ হাজার পিস করে সবসময় সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। এতে এক ধরনের ব্যবসায়ী চক্র বাজার থেকে শতকরা ১০ থেকে ২০ টাকা কমে ধাতব মুদ্রা কিনে ব্যাংকে তাদের হিসাবে জমা করে এবং পরবর্তী সময়ে চেকের মাধ্যমে বা এটিএম বুথ থেকে উত্তোলন করে নিচ্ছে; কিন্তু উত্তোলনের সময় বড় নোট ছাড়া ছোট নোট কিংবা কয়েন গ্রহণ করতে চায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ব্যাংকগুলোর ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপের পাশাপাশি গ্রাহকদের ওপরও টাকা উত্তোলনকালে মোট উত্তোলনের ২০ শতাংশ বা ৩০ শতাংশ ছোট নোট ও পাঁচ শতাংশ কয়েন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা। অন্যদিকে প্রতি বছর ঈদের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক হাজার কোটি টাকার নতুন ছোট নোট বাজারে ছাড়ে, যা গ্রহণ করার জন্য সব মহলের গ্রাহকদের মধ্যে বড় আগ্রহ দেখা যায়। এই সময় গ্রাহকদের নতুন ছোট নোট সরবরাহ করতে না পারলে ব্যাংক ব্যবস্থাপককে অনেক গ্লানিকর কথাও শুনতে হয়। কিন্তু ঈদ-পরবর্তী সময়ে এ ছোট নোটগুলোই শাখা পর্যায়ের ব্যাংকারদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়ায়। তাই এসব কয়েন বা ছোট নোটের প্রচলন বাড়াতে ফিডিং শাখা, প্রতিনিধি ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতার পাশাপাশি গ্রাহক পর্যায়েও এর ব্যবহার এবং গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

তিন. ব্যাংকারদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে, স্থাবর সম্পত্তির বিপরীতে ঋণ দেওয়ার সময় বন্ধকী সম্পত্তির মালিকানাস্বত্ব সঠিক আছে কিনা তা ভ‚মি অফিস, তহসিল অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সশরীরে গিয়ে যাচাই করার জন্য এবং এই মর্মে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারকে নিশ্চয়তা সনদও দিতে হয়। কিন্তু মালিকানাস্বত্বের সঠিকতা যাচাইয়ে ভ‚মি অফিস ও তহসিল অফিসের সহযোগিতা পাওয়া গেলেও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সহযোগিতা পাওয়া দুষ্কর। কারণ তাদের বক্তব্য অনুসারে, অ্যানালগ পদ্ধতিতে মালিকানাস্বত্বের ধারাবাহিকতা যাচাই করা একটি প্রায় অসম্ভব কাজ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যে কক্ষে থাকে সেখানে বহিরাগতদের প্রবেশও সংরক্ষিত। মালিকানাস্বত্বের সঠিকতা যাচাইয়ের পাশাপাশি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সাব-রেজিস্ট্রার কর্তৃক স্বাক্ষরিত নির্দায়ী সনদ নিতে হয় এবং এই নির্দায়ী সনদের সঠিকতা যাচাই করা হয়েছে মর্মেও ব্যাংকারকে নিশ্চয়তা দিতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব নির্দায়ী সনদ দেন দলিল লেখক বা তল্লাশকারকরা। অধিকাংশ সাব-রেজিস্ট্রার সাধারণত নির্দায়ী সনদে সই দেন না; কারণ সাব-রেজিস্ট্রারদের বক্তব্য অনুসারে নির্দায়ী সনদে সই দেওয়া তাদের কর্মপরিধিতে পড়ে না। অর্থাৎ ঋণ প্রক্রিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ ডকুমেন্টটি হচ্ছে একেবারেই কাগজসর্বস্ব। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো রকম তল্লাশি ও দায়িত্ব ছাড়াই দলিললেখক বা তল্লাশকারকরা এই সনদ খানা দিয়ে থাকেন। আর এসব তথাকথিত নির্দায়ী সনদের ওপর ভিত্তি করেই ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়। ফলে পরবর্তী সময়ে বন্ধকী সম্পত্তির মালিকানাস্বত্ব নিয়ে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারের ওপরই তার দায়-দায়িত্ব বর্তায়! অন্যদিকে প্রতিটি শাখার জন্য প্যানেলভুক্ত আইনজীবী থাকা সত্তে¡ও এবং ঋণ দেওয়ার সপক্ষে সংশ্লিষ্ট সেই আইনজীবীর লিখিত মতামত থাকা সত্তে¡ও ব্যাংকের বন্ধকী সম্পত্তির সব দলিল সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতে হয় ব্যাংকারকে এবং এসব দলিলাদির সঠিকতার (জেনুইনেস) দায়-দায়িত্বও ব্যাংকারকেই নিতে হয়।

চার. রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর গৃহনির্মাণ ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কড়াকড়ি আরোপ করে সার্কুলার জারি করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার লেটার নং ৮/২০১৩-এর নির্দেশনা অনুসারে গৃহঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকারকে গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি আইন, যথাÑ১. দ্য বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট, ১৯৫২; ২. বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড, ২০০৬; ৩. বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫; ৪. পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭; ৫. অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন, ২০০৩; ৬. বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভ‚মি উন্নয়ন বিধিমালা, ২০০৪সহ প্রযোজ্য সব আইন ও বিধিমালার পরিপালন নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ একজন ব্যাংকারকে হতে হবে একজন সফল প্রকৌশলী, পরিবেশবিদ ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ!

পাঁচ. সিটিআর, এসটিআর তৈরিকরণ; দুদক, এনবিআর, সিআইসিকে হিসাবের তথ্য প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংকারদের গোয়েন্দাগিরিও করতে হয়। অন্যদিকে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিহতকরণসহ গরুর হাটে জাল নোট শনাক্তকরণ; ছুটির দিনে আয়কর জমা গ্রহণ, গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন প্রদান; প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন; লটারির টিকিট বিক্রি, কনসার্টের টিকিট বিক্রি, ক্রিকেট ম্যাচের টিকিট বিক্রি; ইউটিলিটি বিলের টাকা, আইপিও’র টাকা, হজের টাকা জমা নেওয়া; বিধবা ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর পেনশন প্রদান; ১০ টাকায় কৃষকের হিসাব খোলা; গ্রাহকের চেক ডিসঅনার মামলায় আদালতে প্রতিবেদন জমা প্রদান এবং সাক্ষ্য দেওয়া; স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে স্কুল ব্যাংকিংও এখন ব্যাংকিং সেবার আওতাভুক্ত। নতুন যোগ হওয়া অনেক সেবার মধ্যে আরও আছে বিএসিএইচ, বিইএফটিএন, আরটিজিএস, ইজিপি প্রভৃতি। অর্থাৎ ব্যাংকিং এখন আর আমানত সংগ্রহ আর ঋণ প্রদানের ব্যবসা নয়, ইহা একটি সর্বজনীন পেশা। তাছাড়া মাঝে মধ্যে এমন সব নির্দেশনা পরিপালন করতে বলা হয়, যা পরিপালন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। যেমন একযোগে সব হিসাবে এসবিএস ফরম নিশ্চিত করা, লিগ্যাসি হিসাবে কেওয়াইসি নেওয়া, সব হিসাবের সিআইএফ, টিপি ও কেওয়াইসি নতুন সফটওয়্যারে এন্ট্রি দেওয়া, সব হিসাবে ফ্যাট্কা ফরম নিশ্চিত করা, সব হিসাবের এনআইডি ভেরিফাই করা, ১৪০ পাতার ইউএন স্যাংকশন লিস্ট তল্লাশি করে উল্লিখিত নিষিদ্ধ ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সত্তার হিসাবের তথ্য প্রদান প্রভৃতি। এভাবেই দিন দিন ব্যাংকারের দায়িত্বের পরিসর অসীম থেকে অসীমতর হচ্ছে। তবুও ব্যাংকাররা আনুগত্যের সঙ্গে দিনরাত পরিশ্রম করে, ছুটির দিনে কাজ করে এসব পরিপালন নিশ্চিত করে। কিন্তু এসব পরিশ্রম ও ছুটি কামাই দেওয়ার কোনো মূল্য বা সুবিবেচনা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংকাররা পায় না। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুনাফা একমাত্র স্কেল, যা দিয়ে ব্যাংকারদের কাজের দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়।

ছয়. ক্যাশ, ডিপোজিট ও রেমিট্যান্স ডিপার্টমেন্টের অবস্থান হওয়া উচিত কাছাকাছি (যেসব শাখায় ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু নেই), যাতে করে একটা চেক পোস্টিং দেওয়ার পর কিংবা একটা ফরেন রেমিট্যান্স প্রিন্ট দেওয়ার পর, তা যেন তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সাহায্য ছাড়াই ক্যাশ কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। কিন্তু অনেক ব্যাংক শাখার বিন্যাস (লে-আউট) এই রকম না। ফলে অনেক অসতর্ক কর্মকর্তা পে-অর্ডার, ডিডি প্রস্তুত করার পর দ্বিতীয় কর্মকর্তার স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য এবং ফরেন রেমিট্যান্স ভাউচার প্রিন্ট দেওয়ার পর ক্যাশ বিভাগ থেকে টাকা গ্রহণের জন্য তা সরাসরি গ্রাহকের হাতেই দিয়ে দেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে করে জাল জালিয়াতির সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়ে যায়।

সাত. ব্যাংকারদের বলা হয়, চেক বই ইস্যু করার আগে ‘লেটার অব থ্যাংকস’ পাঠিয়ে গ্রাহক এর ঠিকানা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে। কিন্তু রেজিস্ট্রিকৃত এডিসহ (অ্যাকনলেজমেন্ট) পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা সংবলিত চিঠিও ‘প্রাপককে পাওয়া যায়নি’ মর্মে ফেরত আসে। হিসাবের প্রকৃত লেনদেনের সঙ্গে ঘোষিত টিপি (ট্রানজেকশন প্রোফাইল) সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা নিয়মিত তদারকি করা, প্রতিটি হিসাবের টিপি নিয়মিত হালনাগাদ করা, প্রতিবার টাকা জমা প্রদান কিংবা উত্তোলনকালে তা ঘোষিত টিপির সীমা অতিক্রম করেছে কি না, তা নির্ণয় করা ব্যাংকারের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব, যদি না সফটওয়্যারে স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম দেওয়া থাকে। আবার বর্তমানে কোনো কোনো ব্যাংকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যে কোনো চেকের ওভার-দ্য-কাউন্টার (নগদ) পেমেন্ট দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট চেকদাতার কাছ থেকে কনফারমেশন (পজিটিভ পে ইনস্ট্রাকশন) নিয়ে তারপর পেমেন্ট দিতে (ইহা দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্র–মেন্ট আইন, ১৮৮১ এরও বাহুল্য), যা পরিপালন করা ব্যাংকারদের পক্ষে সম্ভব হয় না বললেই চলে, কারণ গ্রাহকরা এই পদ্ধতিকে বাড়াবাড়ি এবং হয়রানি মনে করে।

আট. কোনো গ্রাহকের হিসাবে জালিয়াতি হলে ‘ব্যালান্স কনফারমেশন সার্টিফিকেট’ নেওয়া হয়েছিল কি না, মর্মে জবাবদিহি করতে হয়। পাঁচ বছরের পুরোনো কোনো একটি গ্রামীণ শাখার কথাও যদি ধরি, তাহলে দেখা যায় কমপক্ষে তিন হাজার সঞ্চয়ী-চলতি অ্যাকাউন্ট থাকে। তাহলে সেই শাখার তিন হাজার সঞ্চয়ী-চলতি হিসাবধারী গ্রাহকের কাছ থেকে একবার কাগুজে কনফারমেশন নিতে কত সময়ের প্রয়োজন?

নয়. গ্রাহকের চেকে কোনো ঘষা-মাজা, ওভার-রাইটিং বা কাটাকাটি থাকলে কিংবা স্বাক্ষর কিছুটা গরমিল থাকলে ব্যাংকার সংশ্লিষ্ট চেকদাতার দ্বিতীয় আরেকটি নিশ্চয়তা স্বাক্ষর (কনফারমেশন সিগন্যাচার) চায়, যাকে গ্রাহকরা হয়রানি মনে করে। কিন্তু ঘষা-মাজাকৃত সেই চেকের বিপরীতে পেমেন্ট হওয়ার পর কোনো জাল-জালিয়াতি ধরা পড়লে আইনি পীড়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারই সমূহ পরিস্থিতির শিকার হন।

দশ. ব্যাংকারকে প্রতি ১৫ দিন পরপর ঋণগ্রহীতার মজুদ পণ্যের বিবরণ (স্টক রিপোর্ট) নিতে বলা হয়, কিন্তু লোকবলের অভাব এবং গ্রাহকদের ব্যস্ততা/অসহযোগিতার জন্য কোনো ব্যাংক শাখাই এই নিয়মটি যথার্থভাবে পরিপালন করতে পারে কিনা সন্দেহ।

এগারো. বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মতে, একজন অফিসার একই সঙ্গে ক্রেডিট অ্যাপ্রুুভাল, ক্রেডিট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও ক্রেডিট রিকভারির দায়িত্বে থাকতে পারবে না, কিন্তু অধিকাংশ শাখাতে একজন অফিসারকে একাই এ তিনটি দায়িত্ব পালন করতে হয়।

বারো. একজন ব্যাংকারকে অবশ্যই প্রচুর পরিমাণে পড়াশোনা করা উচিত। কারণ প্রতিনিয়ত তার ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক অসংখ্য সার্কুলার ইস্যু করছে। এসব সার্কুলার, ব্যাংকের নিজস্ব কর্মপদ্ধতি, সেবানীতি ও অন্যান্য ব্যাংকিং আইন এবং গাইডলাইন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে হলে প্রচুর পরিমাণে পড়াশোনা করা দরকার। কিন্তু ডেস্ক ওয়ার্ক, গ্রাহকসেবা, রিপোর্টিং, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ও মার্কেটিং, নিজের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন- এত সবকিছু সামলে পড়াশেনার সময় বের করাটা আসলেই দুষ্কর।

তেরো. একজন অফিসারকে পরিপূর্ণ ব্যাংকার হতে গেলে প্রত্যেক ডেস্কে কাজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি জেনারেল ব্যাংকিং, ঋণ ও অগ্রিম, বৈদেশিক বাণিজ্য ইত্যাদি প্রতিটা বিভাগেই দক্ষতা অর্জন করতে হয়। বাস্তবে ব্যাংকাররা সেই সুযোগ পাচ্ছে কি? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রধান প্রধান বিভাগীয় শহরগুলোর একজন অফিসারকে যখন বদলি করা হয়, তখন তাকে ওই বিভাগীয় শহরেরই আরেকটি শাখাতেই বদলি করা হয়; কিংবা প্রধান কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তাকে প্রধান কার্যালয়েরই এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে বদলি করা হচ্ছে। এতে করে সুষম বদলি নীতির অভাবে নন-এডি শাখার একজন কর্মকর্তা এডি শাখার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হারাচ্ছে। একইভাবে প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তারা শাখা ব্যাংকিংয়ের সুযোগ হারাচ্ছে এবং শাখা পর্যায়ের ব্যাংকাররাও প্রধান কার্যালয়ের ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাচ্ছে।

চৌদ্দ. দিনশেষে নগদ যে অর্থ (ক্যাশ ইন হ্যান্ড) ভল্টে গচ্ছিত থাকে, তা যথাযথভাবে সর্টিং করে ফ্লাইলিফ দিয়ে ব্যান্ডিং করে সিল-স্বাক্ষর দিয়ে তারপর ভল্টে রাখতে বলা হয়। কিন্তু সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত (যদি সান্ধ্যকালীন ব্যাংকিং সেবা চালু থাকে) যেসব শাখায় লেনদেন চলে, সেখানে ক্লিন ক্যাশ মিলতে সময় লাগে আরও দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। অর্থাৎ লেনদেন-পরবর্তী সময়েও ক্যাশ সর্টিং করার সময় পাওয়া যায় না; আর গ্রাহকসেবা চলাকালে কোনো সুযোগই থাকে না। যেসব শাখা অন্য শাখার ফিডিং শাখা, তাদের ক্যাশসংশ্লিষ্ট ব্যস্ততা তো আরও অনেক বেশি। ফলে বাধ্য হয়েই সাব-স্টাফ দিয়ে ক্যাশ সর্টিং করানো হয়। কিন্তু এতেও অননুমোদিত ব্যক্তি কর্তৃক ক্যাশ সর্টিং করানো হয়েছে মর্মে অডিট আপত্তি উত্থাপন করা হয়।

পনেরো. ব্যাংকিং কার্যক্রমের বর্তমান পরিধি এবং প্রতিনিয়ত যুক্ত হওয়া নিত্যনতুন সেবাগুলোর কথা বিবেচনা করলে, মোটামুটি সাইজের একটি শাখাতেও ১২-১৫ জনের মতো করে কর্মকর্তা দরকার। কিন্তু অনেক শাখাতেই, বিশেষ করে মফস্বলের শাখাগুলোয় এত সংখ্যক অফিসার নেই। ব্যবসায়িক পরিধি ও লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে না প্রয়োজনীয় লোকবলের সংখ্যা। ফলে এসব শাখার অফিসাররা শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতার অতিরিক্ত কার্যভারে ভারাক্রান্ত থাকেন। অন্যদিকে মেট্রো শহরগুলোর অনেক শাখাতেই প্রয়োজনাতিরিক্ত লোকবল থাকার কথা শোনা যায়, আর জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের শাখাগুলো প্রতিনিয়ত প্রয়োজনীয়সংখ্যক অফিসারের সংকটে ভোগে। এভাবে একটি শাখায় একজন কর্মকর্তাকে যখন দুই থেকে তিনজন কর্মকর্তার কাজ একাই করতে হয়, তখন তার ভুলের সম্ভাবনাও দুই থেকে তিনগুণ বেড়ে যায়। আবার প্রতিটি ব্যাংকেই কিছুসংখ্যক প্রভাবশালী অফিসার আছেন, যারা অফিসে থাকা আর না থাকা সমান কথা, কারণ তারা ব্যাংকের চাকরি করতে বাধ্য নন, কিন্তু ব্যাংক তাদের বেতন ও পদোন্নতি দিতে বাধ্য। কারণ তারা বিশেষ মহলের একান্ত ঘনিষ্ঠজন।

শেষ কথা, প্রতিটি ব্যাংকই মুনাফামুখী প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠান, যা আইন তথা নিয়ন্ত্রক সংস্থা দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। পেশা হিসেবে ব্যাংকিং  চ্যালেঞ্জিং, যার বড় পুঁজি ‘গ্রাহক আস্থা’। তাই কোনো অবস্থাতেই ব্যাংকারের কোনো গাফিলতি, ভুল কিংবা অনিয়মের জন্য গ্রাহকসেবা এবং গ্রাহকস্বার্থের বিসর্জন কাম্য নয়। ব্যাংকারকে  তাই তার নিজ ব্যাংককে প্রাণপ্রিয় অবলম্বন মনে করে একটি স্লোগান মনে ধারণ করতে হবে– ‘নিরাপদ থাকুক আমার গ্রাহক, নিরাপদ আমার ব্যাংক, নিরাপদ আমার জীবিকা’।

(নিবন্ধটি ২ জুন ও ৩ জুন ২০১৮ তারিখে শেয়ার বিজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে)

লেখক: ব্যাংকার
[email protected]

১টি মন্তব্য

Leave a Reply