ব্যাংকাররা হুন্ডি নিয়ে কতটা সচেতন?

0
805

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ হুন্ডি বলতে সাধারণত আমরা নন-ব্যাংকিং চ্যানেলে কিংবা অননুমোদিত চ্যানেলে, অর্থাৎ ব্যক্তিগত বিভিন্ন কৌশল ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে একস্থান থেকে অন্যস্থানে অর্থ আনয়ন বা প্রেরণকে বুঝি। বর্তমানে দেশীয় অর্থ পাচার ও বিদেশ থেকে অবৈধ উপায়ে অর্থ আনার প্রধান একটি হাতিয়ার হচ্ছে হুন্ডি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক জরিপে দেখা যায়, প্রবাসীরা বিদেশ থেকে দেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান তার ৪০ শতাংশ আসে ব্যাংকিং চ্যানেলে। বাকি ৬০ শতাংশের মধ্যে ৩০ শতাংশ আসে সরাসরি প্রবাসী বা তাদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে নগদ আকারে। আর বাকি ৩০ শতাংশ আসে হুন্ডির মাধ্যমে। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ আসার পরিমাণ কমে গেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছিল, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসেছে তার তুলনায় ১৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ কম।

বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজারগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণেই মূলত এমনটি ঘটছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স হ্রাসের পেছনে গ্রামাঞ্চলে ব্যাংকের শাখার দূরত্ব, অর্থ পেতে সময়ক্ষেপণ, ব্যাংকারদের অসদাচরণ, নানা ধরনের জবাবদিহিতা, বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্রের প্রয়োজনীয়তা, সাপ্তাহিক ছুটি, অবৈধ অভিবাসীসহ বেশ কয়েকটি কারণও দায়ী। তাছাড়া অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে অর্থ পাঠালে ব্যাংক ফি দিতে হয় না, কিংবা কম দিতে হয়। দেশের বাইরে যারা কেনাকাটা করতে বা ঘুরতে যাচ্ছেন, তাদের অনেকেরই পাঁচ হাজার ডলারে হয় না। আবার অনেকেই চিকিৎসা বা পড়াশোনার বাড়তি খরচ মেটাতেও বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন হুন্ডি থেকে। অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার উচ্চ বিনিময় হারও হুন্ডিকে উৎসাহিত করছে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে বিনিময় হারের ব্যবধান অনেক বেশি, যেমন আনুষ্ঠানিক হারে টাকা পাঠালে এক ডলারে হয়তো ৮০ টাকা পাওয়া যায়। অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে পাঠালে এক ডলারে ৮৩ টাকা পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনেও এসব তথ্য উঠে এসেছে। অর্থাৎ নানা ঝামেলার কারণেই ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন প্রবাসীরা। আর এ সুযোগেই গড়ে উঠেছে রমরমা হুন্ডি বাণিজ্য।

প্রবাসী একশ্রেণির দালাল এবং তাদের কিছু দেশীয় এজেন্ট হচ্ছে হুন্ডি ব্যবসার মূল হোতা। প্রবাসী এসব দালাল বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জানিয়ে দেয় নির্ধারিত ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে যে কোনো অঙ্কের টাকা প্রবাসীর স্বজনের পৌঁছে দেবে। যেসব প্রবাসীর বাড়িতে টাকা পাঠানো জরুরি, তাদের ক্ষেত্রে এ সুযোগ কাজে লাগানো হয়। হুন্ডি ব্যবসায়ী নির্ধারিত ফি’র বিনিময়ে তা পাঠানোর ব্যবস্থা করে। হুন্ডি ব্যবসায়ী তার বাংলাদেশি অংশীদারের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং সে (বাংলাদেশি বিনিয়োগকারী) তার বিলিকরণ কর্মীকে খুদেবার্তার মাধ্যমে প্রাপকদের ফোন নম্বর উল্লেখ করে কাকে কত টাকা দিতে হবে জানিয়ে দেয় এবং তার (বিলিকরণ কর্মী) কাছে কোথায় এবং কে টাকা দিয়ে যাবে, কিংবা সে টাকা কোথায় থেকে সংগ্রহ করবে, তাও বলে দেয়। বিলিকারী কর্মী ওই টাকা সংগ্রহ করে বার্তার মাধ্যমে উল্লেখ করে দেওয়া ফোন নম্বরে ফোন করে টাকাটা নির্ধারিত সময়ে প্রবাসীদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসে। এভাবে বৈদেশিক মুদ্রা দেশেই আসছে না। একইভাবে বিদেশে গিয়ে অর্থের প্রয়োজন হলে প্রবাসীরা এজেন্টদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এবং দেশ থেকে সমপরিমাণ টাকা তাদের এদেশীয় এজেন্টের কাছে পৌঁছে দিলেই হয়ে যায়। এ প্রক্রিয়ায় হুন্ডি ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত নির্ভরতা ও বিশ্বাসের সঙ্গে গ্রাহকের টাকা একস্থান থেকে অন্যস্থানে পৌঁছে দিচ্ছে। ফলে দেশের পাশাপাশি বিদেশেও গড়ে উঠেছে তাদের নেটওয়ার্ক। ইদানীং বাংলাদেশ ব্যাংকের শক্ত অবস্থানের জন্য এই হুন্ডি তৎপরতা অনেকটা কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

নন-ব্যাংকিং চ্যানেলের পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলেও হুন্ডি ব্যবসা হয়। যদিও বলা হয় নন-ব্যাংকিং চ্যানেলে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অর্থ স্থানান্তর কিংবা পাচারই হচ্ছে হুন্ডি, কিন্তু হুন্ডি চক্রের সঙ্গে জড়িত দালালরা দেশের ব্যাংকিং সিস্টেমের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে হুন্ডি ব্যবসাকে আরও জমজমাট করে তুলেছে। হুন্ডির যে টাকা আগে প্রাপকের বাড়িতে সশরীরে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসতে হতো, তা এখন ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবেই অনলাইন ব্যাংকিং, আরটিজিএস, বিইএফটিএন, মোবাইল ব্যাংকিং প্রভৃতির সুবিধা নিয়ে প্রাপকের (প্রবাসীর পরিবার ও স্বজন) কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে, বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে গড়ে তোলা হয়েছে শক্তিশালী চক্র। উল্লেখ্য, কয়েক বছর ধরেই রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে। হুন্ডি ও অন্যান্য অবৈধ চ্যানেলে দেশে রেমিট্যান্স আসার কারণে এটি হয়েছে বলে তদন্তে প্রমাণ পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। হুন্ডির প্রবণতা দেখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দুটি প্রতিনিধিদল গত বছরের মার্চে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরব গিয়েছিল। ওই তিন দেশে গিয়েই দলটি দেখেছে, বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘বিকাশ’-এর নামে রেমিট্যান্সের অর্থ নেওয়া হচ্ছে। পাঁচ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে বাংলাদেশের বিকাশ হিসাবে ওই টাকা জমা হয়ে যাচ্ছে। কিছু এলাকায় ডাচ্-বাংলা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘রকেট’-এর নামেও এ সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রবাসী হন্ডি দালালরা বিদেশ থেকে ই-মেইল অথবা এসএমএসের মাধ্যমে ডলার কিংবা সংশ্লিষ্ট বিদেশি মুদ্রাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করলে বাংলাদেশে বিকাশ এজেন্টরা সেই ডলারের কিংবা সংশ্লিষ্ট বিদেশি মুদ্রার সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে দিচ্ছে।

অন্যদিকে ট্র্যাডিশনাল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যাংকাররাও বুঝে কিংবা না বুঝে হুন্ডি প্রক্রিয়ায় সহায়ক ভূমিকা রাখছে। আর এ ক্ষেত্রে ব্যাংকারদের জ্ঞানগত ও পদ্ধতিগত বা প্রযুক্তিগত ত্রুটিই দায়ী। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রবাসীদের হিসাব সাধারণত দুভাবে খোলা হয়, এক. দেশে থাকাকালেই প্রবাসীর নিজ নামে কিংবা তার প্রকৃত সুবিধাভোগীদের নামে (স্ত্রী, স্বামী, বাবা, মা বা সন্তানদের নামে) হিসাবটি সরাসরি ব্যাংকে এসে খোলেন; দুই. অনেক ব্যাংকের নিজস্ব কিছু সাবসিডিয়ারি কোম্পানি আছে কিংবা চুক্তিবদ্ধ ফরেন মানি ট্রান্সফার কোম্পানি আছে, যারা বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাংক হিসাব খোলার মধ্যস্থতা করে। বিদেশে অবস্থানকারী এসব কোম্পানি ব্যাংক হিসাব খোলার ফরমটি পূরণ করে ডাক বা কুরিয়ার সার্ভিসযোগে দেশে পাঠিয়ে দেয়। সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি ব্যাংক শাখা সেই হিসাবটি খোলে, হিসাব নম্বর এবং চেক বই প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে বিদেশি সেই মধ্যস্থতাকারী কোম্পানির সহায়তায় প্রবাসী সেই গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়। এখানে যে ভুলটি মধ্যস্থতাকারী কোম্পানির কর্মকর্তারা কিংবা ব্যাংকাররা করেন তা হলো, গ্রাহকের পেশা ও আয়ের সঙ্গে অসঙ্গত লেনদেনের অনুমিত মাত্রা (টিপি) সংবলিত হিসাব খোলা। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত টিপি’তে অর্থ জমার বিবরণে ছয় ধরনের জমা উল্লেখ করা আছে, নগদ, ট্রান্সফার, ইনস্ট্র–মেন্টের মাধ্যমে, ফরেন ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স, রফতানি বাবদ প্রাপ্ত, পুঁজিবাজার হিসাব থেকে জমা বা স্থানান্তর ও অন্যান্য। একজন প্রবাসী বাংলাদেশির আয়ের উৎস ফরেন রেমিট্যান্স হওয়াটাই স্বাভাবিক এবং তাই তার হিসাবে জমার ধরনটা ফরেন রেমিট্যান্সই হওয়ার কথা। উল্লেখ্য, যদি গ্রাহকের আয় কিংবা লেনদেন বৃদ্ধির কারণে টিপি’র সীমা লঙ্ঘিত হয়, কিংবা লেনদেনের ধরনে কোনো পরিবর্তন আসে, তাহলে গ্রাহকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে টিপি’র সীমা বা ধরন বাড়িয়ে কিংবা বদলে নেওয়া যায়।

কিন্তু কোনো এক সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মাধ্যমে একজন প্রবাসীর একটি হিসাবের টিপি পরিবর্তন করার জন্য ব্যাংকে একটি ই-মেইল এলো এবং ই-মেইলে টিপি পরিবর্তনের আবেদনে প্রবাসী গ্রাহক যা বললেন, তা হচ্ছে এই রকম, ‘আমি বর্তমানে অমুক দেশে কর্মরত। বর্তমানে দেশে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে আমার অ্যাকাউন্টে প্রায় ২৫ লাখ টাকা জমা করা প্রয়োজন। এ অবস্থায় আমি আমার লেনদেন সীমা পরিবর্তন করতে চাই।’ টিপি’র এই আবেদনে ২৫ লাখ টাকার সবটাই নগদে (ক্যাশ) জমা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মহসিন (ছদ্মনাম) নামের আরেক গ্রাহক ব্যাংকে এসে ম্যানেজারকে বললেন, ‘স্যার, আমার ছেলে বিদেশ থেকে টাকা ছাড়ছে, কিন্তু আমার হিসাবে নাকি টাকা ঢুকছে না!’ ম্যানেজার: কেন? কী সমস্যা? গ্রাহক: কী জানি, টিপি না কী, যেন ঠিক নেই। কথা শেষ হতে না হতেই গ্রাহকের ফোনে কল এলো। পাবনা থেকে রহিম (ছদ্মনাম) নামের কেউ একজন ম্যানেজার সাহেবের সঙ্গে কথা বলবেন। ‘জনাব, মহসিনের অ্যাকাউন্টে আমি তিন লাখ টাকা পাঠাতে চাচ্ছি, কিন্তু টিপি ঠিক নেই বলে টাকা ঢুকছে না।’ ম্যানেজার: আপনি কে বলছেন? রহিম: আমি রহিম। ম্যানেজার: আপনি মহসিন সাহেবের কী হন? রহিম: আমি তার ছেলের বন্ধু। ম্যানেজার: কীসের টাকা পাঠাচ্ছেন? রহিম সাহেবের উত্তর: পাওনা টাকা। ম্যানেজার সাহেব বুঝলেন, এটি বৈধ লেনদেন নয় এবং ঘোষিত টিপি’র সঙ্গে অসংগত জমা হচ্ছে বলেই ব্যাংকিং সফট্ওয়্যার লেনদেনটি অ্যালাউ করছে না। তাই তিনি কমিম্পউটারে মহসিন সাহেবের হিসাবের বিবরণী (স্টেটমেন্ট) জেনারেট করে দেখলেন, বিদেশ থেকে টাকা আসার কথা থাকলেও টাকা আসছে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে। অর্থাৎ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনলাইনের মাধ্যমে নগদ টাকা জমা হচ্ছে। একেক মাসে একেক জায়গা থেকে টাকা জমা হচ্ছে।

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশির বাংলাদেশস্থ কোনো একটি ব্যাংক হিসাবে অর্থ (রেমিট্যান্স) পাঠালে তা ডিজিটাল মানি আকারে তার হিসাবে জমা হওয়ার কথা, কিন্তু কোনোভাবেই নগদ জমা হওয়ার কথা নয়। নগদ জমা হওয়ার অর্থ, প্রবাসী তার অর্থ কোনো হুন্ডি ব্যবসায়ী এজেন্ট কিংবা দালালের মাধ্যমে পাঠাচ্ছেন এবং অর্থ বিদেশ থেকে ‘ব্যাংক-টু-ব্যাংক’ পদ্ধতিতে তার অ্যাকাউন্টে না ঢুকে ‘পারসন-টু-ব্যাংক’ পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকেই তার হিসাবে ঢুকছে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে প্রবাসীর পাঠানো অর্থ বৈধ হলেও অর্থ পাঠানোর মাধ্যমটি বৈধ নয়। আমাদের ব্যাংকাররাও অনেকেই যারা হিসাব খোলেন, তারা টিপি যথার্থভাবে পূরণ করে না বা করতে পারে না। যেমন হিসাব খুলছেন একজন প্রবাসীর, আর জমার ধরনে সিলেক্ট করছেন ক্যাশ, কিংবা ক্যাশ জমা দেখাচ্ছেন বেশি করে আর ফরেন রেমিট্যান্স খাতে জমা দেখাচ্ছেন কম করে। ফলে গ্রাহকের হিসাবের অর্থের উৎস বা আয়ের ধরনের সঙ্গে জমার ধরন সাংঘর্ষিক হয়ে যায়।

প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে আসতে ব্যাংকারদেরও কিছু করণীয় আছে, যেমন-
এক. অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রবাসীদের কিংবা তাদের প্রকৃত সুবিধাভোগীদের হিসাব খোলা এবং হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কাগজপত্রের চাহিদা সহজীকরণ;
দুই. প্রবাসী বা তাদের প্রকৃত সুবিধাভোগীদের হিসাবে রেমিট্যান্স দ্রুত পাঠানো বা জমাদানের ব্যবস্থা করা এবং অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স-সংক্রান্ত তাদের ফোন কল, ই-মেইল কিংবা যেকোনো জিজ্ঞাসার তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়া; তিন. টিপি যেন হিসাবধারীর পেশা ও আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়, সেদিকে লক্ষ রাখা;
চার. প্রবাসীর হিসাবে জমার ধরন হিসাবে শুধু ফরেন রেমিট্যান্স অনুমোদন করা;
পাঁচ. ক্যাশ জমা অনুমোদন করলেও তা যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা;
ছয়. ম্যানুয়াল পদ্ধতির পাশাপাশি কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে লেনদেন মনিটরিং, স্ক্রিনিং করা ও অননুমোদিত লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম্পিউটারাইজড প্রোগ্রামের মাধ্যমে বন্ধ (ব্লক) করে দেওয়া;
সাত. টিপি হালনাগাদ করা;
আট. প্রবাসী গ্রাহকদের এবং দেশে অবস্থানরত তাদের প্রকৃত সুবিধাভোগীদের ভয়-ভীতি না দেখিয়ে কাউন্সেলিং করা এবং ব্যাংক-টু-ব্যাংক সিস্টেমে অর্থ পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করা;
নয়. প্রবাসী হয়রানি কমিয়ে সেবার মান বাড়ানো;
দশ. ব্যাংকগুলোকে রেমিট্যান্স প্রক্রিয়াকরণ, প্রেরণ চার্জ কমাতে হবে;
এগারো. ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোকে উদ্বুদ্ধকরণে বিভিন্ন প্রণোদনামূলক কর্মসূচি অব্যাহত রাখা, যেমন উপজেলা পর্যায়ে বার্ষিক ভিত্তিতে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রেরণকারীর সম্মাননা; রেমিট্যান্স গ্রহণকারীদের জন্য লটারি, আর্থিক প্রণোদনা, পুরস্কার প্রভৃতির ব্যবস্থা রাখা;
বারো. বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে প্রতিটি ব্যাংক শাখায় রেমিট্যান্স হেল্প ডেস্ক স্থাপন এবং প্রবাসীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করার ব্যবস্থাসহ অন্যান্য নির্দেশনা পরিপালন নিশ্চিত করা;
তেরো. নবীন কর্মকর্তাকে অ্যাকাউন্ট ওপেনিংয়ের দায়িত্ব না দিয়ে সিনিয়র ও অভিজ্ঞ এবং ব্যাংকিং জ্ঞানস¤পন্ন কোনো কর্মকর্তাকে দেওয়া। ঠিক একইভাবে গুরুত্ব দিতে হবে শাখার মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা বামেলকো (ব্রাঞ্চ অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসার) মনোনয়নে;
চৌদ্দো. দেশীয় হুন্ডি দালাল, যারা ব্যাংকের গ্রাহক সেজে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠায়, তাদের টিপি মনিটর করা এবং অসংগত বা সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিহতকরণ এবং প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানানো। যাদের ব্যাংক হিসাব নেই, তাদের কোনো অনলাইন জমা গ্রহণকালে অবশ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে অর্থপ্রেরকের পরিচয়পত্র নিয়ে পাঠানো অর্থের উৎস, অর্থ পাঠানোর উদ্দেশ্য, প্রাপকের পরিচিতি নিশ্চিত হয়ে তারপর অর্থ প্রেরণ;
পনেরো. দেশীয় হুন্ডি দালাল, যারা প্রবাসী কিংবা রেমিট্যান্স গ্রহণকারীদের আত্মীয়, বন্ধু বা ব্যবসায়িক অংশীদার পরিচয়ে ফোন দিয়ে জানতে চায় যে, ‘টাকাটা প্রবাসীর কিংবা প্রবাসীর প্রকৃত সুবিধাভোগীর অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে কি না’, তাদের মোবাইল ফোন নম্বর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অবহিতকরণ;
ষোলো. ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণকারী প্রবাসীদের অপেক্ষাকৃত বেশি মুনাফা দেওয়া এবং সহজ শর্তে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান।

বাণিজ্যিক ব্যাংকমাত্রই মুনাফাধর্মী প্রতিষ্ঠান। এ মুনাফার বড় আসে ঋণের বিপরীতে প্রাপ্ত সুদ থেকে, আর আমানতকারীদের জমাকৃত টাকাই ঋণ হিসাবে দিয়ে থাকে ব্যাংক। ব্যাংকের আমানতের একটা বড় অংশ রেমিট্যান্স। তাই ব্যাংক তার ব্যবসায়িক স্বার্থে প্রবাসী গ্রাহকদের সঙ্গে আইনি কড়াকড়িতে নাও যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও বড় ভূমিকা রাখতে হবে। যেমন-
এক. সব ব্যাংককে হুন্ডি প্রতিরোধে একই আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামোতে নিয়ে আসা, যেমন আইনের পরিপালন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা কিংবা সামর্থ্যরে কারণে যে অবৈধ বা সন্দেহজনক লেনদেনটি একটি ব্যাংক অ্যালাউ করল না, সেই একই লেনদেনটি যেন অন্য আরেকটি ব্যাংক আইনের তোয়াক্কা না করে কিংবা প্রযুক্তিগত অদক্ষতা বা অসামর্থ্যরে কারণে কিংবা আমানত প্রাপ্তির লালসায় অ্যালাউ না করে;
দুই. প্রবাসী রেমিট্যান্সকে সরকারি মাশুলমুক্ত করে দেওয়া;
তিন. বৈধ উপায়ে ডলার কেনা-বেচাকে হয়রানিমুক্ত ও সহজ করতে হবে এবং ডলার বহনের সীমা আরও বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে;
চার. বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রবাসীদের জন্য রেমিট্যান্স কার্ড চালু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণের ভিত্তিতে তাদের সন্তানকে স্কুলে ভর্তি, হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা, দূতাবাস সেবা (যেমন প্রবাসে দুর্ঘটনা হলে সহায়তাপ্রাপ্তি, কিংবা মারা গেলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মরদেহ দ্রুত স্বদেশে পাঠানো এবং ডেথ বেনিফিট আদায় করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর নিশ্চিতকরণ) গ্রহণে অগ্রাধিকার, ব্যাংক হিসাবে বার্ষিক এক্সাইজ ডিউটি ও উৎসে কর কর্তনে অব্যাহতি;
পাঁচ. বিদেশে বাংলাদেশি ব্যাংকের মালিকানাধীন এক্সচেঞ্জ হাউজের সংখ্যা বাড়ানো;
ছয়. নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুবিধার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে প্রবাসী ও তার সুবিধাভোগীদের ব্যাংক হিসাব খোলা বাধ্যতামূলক করা;
সাত. প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোকে আরও প্রবাসীবান্ধব হওয়া;
আট. প্রবাসীদের জন্য বিমানবন্দরে বিশেষ ডেস্ক চালু করা;
নয়. বৈদেশিক মুদ্রা বিশেষ করে ডলারের বিনিময় হার প্রবাসীদের জন্য যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা;
দশ. ব্যাংকগুলোর প্রবাসী সেবার মান বৃদ্ধি করায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি বাড়ানো;
এগারো. রেমিট্যান্স পাঠানোর পদ্ধতি ও সুফল উল্লেখ করে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুক, টুইটার প্রভৃতি), রেমিট্যান্স প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠানের অ্যাসোসিয়েশন ও ব্যক্তিপর্যায়ে নিবিড় যোগাযোগ বাড়ানো এবং প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধি করা;
বারো. হুন্ডি দালালদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা;
তেরো. মোবাইলবেস্ড মানি ট্রান্সফার ব্যবস্থাকে আরও বিধিবদ্ধ করে ব্যাংকিং মাধ্যমের সঙ্গে সংযুক্ত করে যথাযথ উপায়ে ব্যবহার করা এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানো এবং কড়াকড়ি আরোপ করা;
চৌদ্দো. রেমিট্যান্স পাঠাতে ‘জি-টু-জি (সরকার-টু-সরকার)’ বা ‘বি-টু-বি (ব্যাংক-টু-ব্যাংক)’ পদ্ধতি গড়ে তোলা।

লেখকঃ মোশারফ হোসেন, ব্যাংক কর্মকর্তা

Leave a Reply