ব্যাংকার: করোনার যুদ্ধে এক “অর্থ সৈনিক”

0

করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে যখন গোটা পৃথিবীটা নিস্তব্ধ-নিশ্চুপ, নিরবতায় স্তব্ধ। ঘরে আবদ্ধ। স্রষ্টার কাছে তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আজ নিজের ক্ষুদ্রতা এবং সীমাবদ্ধতার উপলব্ধি প্রকাশ করছে। অদৃশ্য শত্রু, অসামান্য এই প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো আজ দুর্বল, নিরুপায়, অসহায়। যাদের বগল তলায় থাকে আণবিক শক্তি আজকের যুদ্ধে তারাও চরমভাবে ব্যর্থ।

করোনার তাড়নায় রাজনীতি এখন গর্তে লুকিয়ে “স্টে হোম-Stay Home” এর স্লোগান দিচ্ছে। তবে এমন দুর্যোগেও লকডাউন হয়নি দুর্নীতির উৎসব। চাল চুরি তার উত্তম উদাহরণ। প্রায় প্রতিদিনই সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল দৌড়াতে দৌড়াতে রাস্তায় প্রাণ হারাচ্ছে অনেক সাধারণ রোগী। আজকে প্রাণের ভয়ে চিকিৎসকের মত এমন মহৎ পেশার মানুষগুলো ও অমানসিকতার পরিচয় দিচ্ছে।

মারাত্মক ছোঁয়াচে এই করোনাভাইরাস অর্থনীতি কেউ ছুঁয়েছে। আক্রান্ত করেছে মারাত্মকভাবে। এই মুমূর্ষু অর্থনীতিকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস চালিয়ে নেওয়ার জন্য অক্সিজেন এবং ভেন্টিলেটর এর ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে। ব্যাংকাররা হলো এই মুমূর্ষ অর্থনীতির চিকিৎসক। ব্যাংকের শাখাগুলো যেন অর্থনীতির হাসপাতাল। ব্যাংকার অর্থাৎ এসব “অর্থ চিকিৎসক” পরিবার তথা নিজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যাংকিং সেবাকে অব্যাহত রেখেছে অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে। একজন ‘অর্থ চিকিৎসক’ মনে করে জীবন ও অর্থ একে অপরের পরিপূরক।

করনা মহামারীর এই যুদ্ধে মৃত্যুভয়কে তুচ্ছজ্ঞান করে অনেক সাহসী স্বাস্থ্যকর্মীরা সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত সৈনিকরাও রয়েছে যুদ্ধের ময়দানে এই অদৃশ্য শত্রুকে পরাজিত করতে। শত ব্যস্ততাকে দূরে ঠেলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে প্রত্যেকেই নিজ নিজ গৃহে আবদ্ধ থেকে এই যুদ্ধে শামিল হয়েছে।

ভাইরাসের এমন মহামারীতে যখন দেশের সমস্ত কিছুই বন্ধ লকডাউন হয়ে রয়েছে সেই পরিস্থিতিতে ব্যাংকাররা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে একটুও পিছপা হয়নি। করোনা ভাইরাস বিরোধী এই যুদ্ধে “অর্থ সৈনিক” হল ব্যাংকার। এ সকল “অর্থ সৈনিক” ব্যাংকাররা হলো দেশের অর্থনীতিকে চালিয়ে নেওয়ার এক অর্থবহ বাহক।

এই সকল অর্থ সৈনিক ব্যাংকাররা মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে যুদ্ধের অর্থ-রসদ সরবরাহে নিরবচ্ছিন্নতা বজায় রাখছেন। এই করোনা যুদ্ধের শহীদ হওয়া প্রথম ব্যক্তি একজন অর্থ সৈনিক। যিনি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রতিদিনই কোন না কোন ব্যাংকার আক্রান্ত হচ্ছে। লম্বা হচ্ছে এর তালিকা।

অতি নিরীহ-নিরব অর্থ সৈনিকরা করোনার এই মহামারীর দিনে মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে দেশের অর্থ প্রবাহকে সচল রাখতে। তবে এদের অবদানের স্বীকৃতি ব্যাপারে রাষ্ট্র খুবই উদাসীন, বেখালিপনার পরিচয় দিচ্ছে। ব্যাংকাররা নিজেদের স্বার্থ এবং অবদানের স্বীকৃতির ব্যাপারে কখনোই উচ্চবাচ্য করেনি। এরা কাজ করে নীরবে ভিতর থেকে।

কিন্তু অনেক অর্থ সৈনিকরা নিয়মিতই নব্য দাসত্বের শিকার হচ্ছেন। মানসিক অস্থিরতা এ সকল দাসদের পিছন ছাড়ছে না। এরা কেউ কেউ নিজের ইচ্ছেকে জলাঞ্জলি দিয়ে অন্যের ইচ্ছায় শ্রম দেয়। কর্তার ইচ্ছায় করে কর্ম। সুবিধাবাদীদের সুবিধা দেওয়ার নিরিখে এরা কেউ কেউ নিয়োগকৃত হয়। তবে এদের ভদ্র পরিচয় ব্যাংকার। এরা চাকরিজীবী। চাকরি ফারসি শব্দ। শাব্দিক দিক থেকে চাকরিজীবীকে ‘মনিবের চাকর’ বলা হলে ক্ষেপে যান।

এই সব চাকরিজীবী বা আধুনিক করপোরেট দাসরা মেধা ও জ্ঞানকে নিংড়ে দেয়। ইচ্ছেকে দেয় বন্ধক। অন্য সকল প্রাণীর মত এরাও বাঁচে নিঃশ্বাসে, আশা আর আশ্বাসে। এই আশ্বাস অনেকটা গাধার সামনের পদোন্নতির মুলা। এখানে থাকতে চাইলেই থাকা যায় না। যেতে চাইলেও যায় না যাওয়া। সৎ, সরল আর বিনয়ীরা আটকে যায় নীতিহীনতার এর বেড়াজালে। করপোরেট দাসত্বের শৃঙ্খল ছিন্ন করার শক্তি এদের অনেকেরই নেই। এসব মনিবরা সংখ্যায় কম হলেও করপোরেট পরিবেশ দূষণে যথেষ্ট।

ব্যাংকাররা সততার প্রশ্নে যথেষ্ট সমৃদ্ধ। কিন্তু নিজেদের একতার প্রশ্নে চরমভাবে এরা উদাসীন। একজন ব্যাংকার গ্রাহকের আর্থিক নিরাপত্তা, বিশ্বস্থতা এবং গোপনীয়তা প্রদানে পেশাগতভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। অথচ আজও নিজেরা নিজেদের স্বার্থে এক হওয়ার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হতে পারল না। তবে পারবে। কারণ ব্যাংকাররা বাঁচে আশা আর আশ্বাসে, গ্রাহকের বিশ্বাসে। এরা জানে, একদিন এই ভাইরাসের ঝড় থেমে যাবে। পৃথিবী আবার শান্ত হবে। ফিরে পাবে আত্মমর্যাদা।

লেখক: মোঃ কামরুজ্জামান সুমন
বিশিষ্ট ব্যাংকার ও কলাম লেখক

Leave a Reply