ব্যাংক লোন বা বিনিয়োগ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং পর্ব-১

0
4159

ব্যাংকের ঋণ বা বিনিয়োগ হলো ব্যাংকের অন্যতম একটি বিষয়। কেননা ব্যাংকের লাভ বা মুনাফা নির্ভর করে ঋণ বা বিনিয়োগের উপর। ব্যাংকসমূহ কর্তৃক প্রদত্ত বিনিয়োগ বা ঋণের কতিপয় অংশ অনেক সময় খেলাপি থেকে যায়। আর এই খেলাপি বা মেয়াদোত্তীর্ণ বা অনাদায়ী বিনিয়োগ বা ঋণকে তার সময়সীমা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেছে। Loan/Investment Classification ব্যাংকারদের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যা ধারাবাহিকভাবে ৬ পর্বে প্রকাশিত হবে। আজ Loan/Investment Classification এর ১ম পর্ব প্রকাশ করা হলো। আশা করছি সকলের কাজে লাগবে।

• Loan/Investment Classification এর সংজ্ঞা
ব্যাংকগুলোর অন্যতম প্রধান Asset বা সম্পদ হচ্ছে তার (Investments or Loans) বিনিয়োগ বা ঋণ। আর এই ব্যাংকসমূহ কর্তৃক প্রদত্ত বিনিয়োগ বা ঋণের কতিপয় অংশ অনেক সময় খেলাপি থেকে যায়। এই খেলাপি বা মেয়াদোত্তীর্ণ বা অনাদায়ী বিনিয়োগ বা ঋণকে তার সময়সীমা অনুযায়ী বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। বিনিয়োগ বা ঋণের এই শ্রেণীবিভাগকে Classification of Investment/Loan বা বিনিয়োগ/ঋণ শ্রেণীবিন্যাস বলা হয়।

অন্যকথায় রিস্ক বা ঝুঁকির মাত্রার ভিত্তিতে বিনিয়োগ বা ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশিত নিয়মে সাজানোকে বিনিয়োগ বা ঋণ শ্রেণীকরণ বা Classification of Loan/Investment বলা হয়।

Loan/Investment Classification সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রদত্ত সংজ্ঞা হলো-
It is differentiating, grouping or arranging or categorizing of loans and advances based on the perceived risk and other relevant characteristics.

Loans are categorized according to their status like unclassified, substandard, doubtful and bad-loss based on given criteria.
অর্থাৎ ঝুঁকি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বৈশিষ্ট্যগুলোর উপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ বা ঋণ এবং এডভান্স এর বিভেদ, শ্রেণীভুক্ত বা সংগঠিত বা শ্রেণীকরণ করা হয়।

প্রদত্ত মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে অশ্রেনীকৃত, মান, বিশেষ চিহ্নিত হিসাব, শ্রেনীকৃত, নিম্নমান, সন্দেহজনক ও মন্দ/ক্ষতিজনকের মত বিনিয়োগ বা ঋণগুলো তাদের অবস্থা অনুযায়ী শ্রেণীভুক্ত করা হয়।

শ্রেণীকৃত বিনিয়োগ বা ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি ও স্থগিত লাভ বা সুদের পরিমাণ নির্ণয় করা বিনিয়োগ বা ঋণ শ্রেণীকরণের আসল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের সকল ব্যাংকসমূহের বিনিয়োগ বা ঋণ শ্রেণীবিন্যাস ও Provisioning অত্যন্ত জরুরী এবং আবশ্যকীয়।
নিম্নে বিনিয়োগ বা ঋণ শ্রেণীবিন্যাসকরণ ও Provisioning এর নীতিমালাসমূহ আলোকপাত করা হলো-

• History of Loan/Investment Classification বা ঋণ/বিনিয়োগ শ্রেণীবিন্যাসকরণের পটভূমি
ঋণ/বিনিয়োগ শ্রেণিবিন্যাসকরণ প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি সংশোধিত নীতিমালা চালু করে। পাঁচটি বিভিন্ন পর্যায়ে ডিসেম্বর, ১৯৯৮-এর মধ্যে নতুন শ্রেণিকরণ পদ্ধতির বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়। নতুন পদ্ধতিতে শ্রেণিকরণের জন্য বিনিয়োগ/ঋণের মেয়াদকাল পূর্বের তূলনায় বহুল মাত্রায় কমানো হয় এবং শ্রেণিকরণের স্তর বাড়ানো হয়। ঋণ/বিনিয়োগ শ্রেণিকরণের প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্দেশ্যে ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকগুলিকে নতুন দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়। অপরদিকে নতুন পদ্ধতিতে প্রদত্ত ঋণ/বিনিয়োগকে ৪টি বিভিন্ন নামে চিহ্নিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশ জারি করে। নির্দেশানুযায়ী বিভিন্ন প্রকার ঋণকে চলমান ঋণ/বিনিয়োগ, তলবি ঋণ/বিনিয়োগ, মেয়াদি ঋণ/বিনিয়োগ এবং স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ/বিনিয়োগ নামে অভিহিত করা হতে থাকে। সংশোধিত পদ্ধতিতে শ্রেণিবিন্যাসকরণ এবং সঞ্চয় নির্ণয়ের জন্যও নতুন নিয়ম চালু করা হয়। তদনুযায়ী,

ক. ৩ মাস বা ততোধিক কিন্তু ৬ মাসের কম সময় পর্যন্ত কোনো ঋণ/বিনিয়োগ অনাদায়ী বা মেয়াদোত্তীর্ণ থাকলে ওই ঋণ/বিনিয়োগকে ‘নিম্নমান’,
খ. ৬ মাস বা ততোধিক কিন্তু অনধিক ১ বছর সময় ধরে অনাদায়ী হলে ‘সন্দেহজনক’ এবং
গ. এক বৎসরের অধিক সময় মেয়াদোত্তীর্ণ হলে ওই ঋণ/বিনিয়োগকে মন্দ বা লোকসানি শ্রেণির বিবেচনা করা হয়। একই সঙ্গে উল্লিখিত নিম্নমান, সন্দেহজনক এবং মন্দ শ্রেণিভুক্ত বিনিয়োগ/ঋণের জন্য যথাক্রমে ২০%, ৫০% এবং ১০০% হারে সঞ্চয় সংরক্ষণের নতুন নিয়মও চালু করা হয়। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোকে প্রথম পর্যায়ে বাৎসরিক ভিত্তিতে এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে যথাক্রমে ষান্মাসিক ও ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ঋণ/বিনিয়োগসমূহ শ্রেণিবিন্যাসকরণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আরও নির্দেশ দেওয়া হয়, ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শ্রেণিবিন্যাস করার জন্য নতুন, নবায়নকৃত ও পুনঃতফশিলীকৃত ঋণ/বিনিয়োগকে নতুন ঋণ/বিনিয়োগ হিসেবে অভিহিত করা হবে এবং ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সঞ্চয় সংরক্ষণ করতে হবে।

ঋণ/বিনিয়োগ শ্রেণিবিন্যাসকরণ ও প্রভিশনিং-এর মানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীতকরণের প্রয়াসে ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে গৃহীত দুরদর্শিতামূলক নিয়মাচারের সময়ে সময়ে পরিবর্তন সাধন করে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বিশেষ চিহ্নিত হিসাব’ ব্যবস্থার প্রবর্তন করে যেখানে ৯০ দিন বা তার অধিক সময়ের জন্য অনাদায়ী ঋণ/বিনিয়োগ প্রদশিত হবে এবং এর ওপর আরোপিত মুনাফা/সুদে ‘সাসপেন্স’ সুদ/মুনাফা আয় হিসেবে না ধরে ‘সাসপেন্স সুদ/মুনাফা হিসেবে’ জমা করতে হবে। তবে বিশেষভাবে চিহ্নিত এ সব হিসাবের ঋণ/বিনিয়োগকে খেলাপী ঋণ/বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা হবে না, বরং বিনিয়োগ/ঋণের দুর্বলতা নির্দেশপূর্বক পূর্ব সতর্কতামূলক সংকেত হিসেবে তা গণ্য হবে। এ সব বিনিয়োগ/ঋণের জন্য ব্যাংকসমূহকে সাধারণভাবে শতকরা ৫ ভাগ হারে অতিরিক্ত স্থিতি রাখতে হবে। ফলে পূর্বে চালুকৃত ৪ ধরনের শ্রেণি বিন্যাসিত বিনিয়োগ/ঋণের বিপরীতে তা ৫ ধরনের শ্রেণি বিন্যাসে উন্নীত হয়। ২০০৭ সাল হতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকসমূহের স্থিতিপত্র বহির্ভূত অবস্থানের শতকরা ১ ভাগ অতিরিক্ত রাখার বিধানও চালু করে।

এছাড়া ঋণ/বিনিয়োগ শ্রেণিবিন্যাসকরণ ও প্রভিশনিং-এর মানকে আর উন্নত করার জন্য সর্বশেষ যে সার্কুলার গুলো ইস্যু হয় তা নিম্নে তুলে ধরা হলো- BRPD সার্কুলার নং-২০১২ এর ১৪, ২০১২ এর ১৯, ২০১৩ এর ০৫ এবং ২০১৪ এর ১৬ তারিখ ২৩/০৯/২০১২, ২৭/১২/২০১২, ২৯/০৫/২০১৩ এবং ১৮/১১/২০১৪ ।

চলবে. . . . . . . . . . . . . .

লেখকঃ মোহাম্মদ শামসুদ্দীন আকন্দ, ব্যাংকার।

Leave a Reply