বীমা শিল্পে নতুন সম্ভাবনা ব্যাংকাস্যুরেন্স

0

মুহাম্মাদ আসিফ সামছঃ কভিড-১৯-এর জন্য পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেকেই স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং কিভাবে কাছের মানুষদের সুরক্ষিত রাখা যায় সে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছেন। জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাসংক্রান্ত এই ভাবনাগুলো দেশের ক্রমবর্ধমান বীমাশিল্পের প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বীমার পেনিট্রেশন বা বিস্তার জিডিপির মাত্র ০.৫ শতাংশ, যা বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলোর গড় হার ৩.৩% থেকে বেশ পিছিয়ে রয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষই কেন পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই জীবন যাপন করছেন? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর কারণ হচ্ছে সচেতনতা এবং সুযোগের অভাব। বৈশ্বিক মহামারির ফলে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ইতিবাচক ঘটনার মধ্যে একটি হচ্ছে অন্যান্য অনেক শিল্পের মতো বীমাশিল্পেও দ্রুত ডিজিটাল অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তাই এখন অনলাইনে সেবা গ্রহণ গ্রাহকদের জন্য সহজতর হয়েছে। জীবন এবং স্বাস্থ্য বীমা একটি সুচিন্তিত ক্রয়, আর সঠিক কাভারেজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বেশির ভাগ মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে অভিজ্ঞ কারো সঙ্গে আলোচনা করতে পছন্দ করেন।

সুখবর হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার এই চাহিদাটিকে স্বীকৃতি দিয়ে নতুন মাধ্যমসমূহ চালু করার বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে এবং সেই সঙ্গে বীমা সুরক্ষাসংক্রান্ত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং বীমার সম্পূর্ণ সুবিধা লাভ করার জন্য মানুষ যাতে প্রয়োজনীয় সেবা ও পরামর্শ পেতে পারেন, সে জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

বীমা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংকের সক্ষমতাকে কাজে লাগায় ব্যাংকাস্যুরেন্স
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), বিদ্যমান এজেন্সিভিত্তিক বিপণন মডেলটির পরিপূরক হিসেবে একটি নতুন মাধ্যম ব্যাংকাস্যুরেন্সকে নিয়ে গবেষণা করছে, যা মূলত হচ্ছে ব্যাংকের মাধ্যমে বীমা সেবা বিক্রয়। ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে আরো বেশিসংখ্যক গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর এবং তাদের আর্থিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা মেটাতে সহায়তা করার সুযোগ রয়েছে। ব্যাংকাস্যুরেন্সের আরেকটি সুবিধা হচ্ছে এর মাধ্যমে গ্রাহকরা তাদের ঋণ এবং সঞ্চয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বীমা সুরক্ষার দিকে নজর দিতে পারেন।

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ (A Platform for Bankers Community) প্রিয় পাঠকঃ ব্যাংকিং বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ এ লাইক দিন এবং ফেসবুক গ্রুপ ব্যাংকিং ফর অল এ জয়েন করে আমাদের সাথেই থাকুন।

সাধারণভাবে ব্যাংকাস্যুরেন্স ব্যবস্থায় ব্যাংক এবং বীমা প্রতিষ্ঠান অংশীদারির মাধ্যমে ব্যাংকের বিপণন নেটওয়ার্ক (শাখা, কল সেন্টার, ডিরেক্ট সেলস ফোর্স) ব্যবহার করে বীমা প্রতিষ্ঠানের সেবা তার গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেয়। এই ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো ‘স্ট্যান্ড-অ্যালোন’ বীমা হিসেবে অথবা সাধারণ ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে (যেমন—ডিপোজিট পেনশন স্কিম, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদিতে) ‘সংযুক্ত’ হিসেবে বীমা পরিকল্পনা বিক্রি করে। যদিও ব্যাংকাস্যুরেন্সকে এক ধরনের বীমা মনে করা খুব সাধারণ একটি ব্যাপার, কিন্তু এটি আসলে একটি বিপণন ব্যবস্থা, এ ক্ষেত্রে অংশীদারির সময় ব্যাংক ও বীমাকারী উভয়েরই এটি বিবেচনা করা উচিত।

ব্যাংকিং খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং আর্থিক খাতের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ আর্থিক ব্যবস্থার নাগালের বাইরে রয়েছে। ব্যাংকগুলো ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবাদাতাদের (এমএফএস) সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং এজেন্ট ব্যাংকিং মডেলের মতো উদ্ভাবনী ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে ডিপোজিট অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ১৩.২৪ কোটি, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৩৩.৬০ শতাংশ বেশি। ২০১৯ সালের বীমা খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, সক্রিয় জীবন বীমা পলিসির সংখ্যা ছিল প্রায় ৯০ লাখ এবং বীমার আওতায় থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল দুই কোটি।

যদিও ব্যাংকিং খাত এবং বীমা খাতের প্রবৃদ্ধির মধ্যে তুলনা করা সম্ভব নয়, তবে উভয় খাতই তাদের সক্ষমতা এবং গ্রাহক ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে একসঙ্গে দেশকে বৃহত্তর আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দিকে পরিচালিত করতে পারে।

ব্যাংকাস্যুরেন্স আর্থিক খাতকে সফল হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়
বৈশ্বিক মহামারি বীমাকারীদের জন্য দ্রুত এবং জরুরি ভিত্তিতে বিপণনব্যবস্থার ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্বটিকে সামনে এনেছে। এখন পর্যন্ত বীমা ক্ষেত্রে লেনদেনের বেশির ভাগ বিষয়, যেমন—আবেদন জমা দেওয়া, প্রিমিয়াম প্রদান এবং দাবি আবেদন অনলাইনে করা যায় অথবা প্রক্রিয়াগুলো ডিজিটাইজ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। উদ্ভাবনী উপায়ে এবং ডিজিটাল টাচ পয়েন্টের মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা প্রদানে বীমাকারীদের ব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারির ভিত্তিতে আরো সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন ব্যাংকের ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলের মাধ্যমে তাদের বিপুলসংখ্যক গ্রাহককে বীমা সুবিধা দিতে পারে, তেমনি ব্যাংকগুলোও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আয়ের নতুন উৎস খুঁজে পাবে এবং প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেবায় বৈচিত্র্যও আনতে পারবে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকে তাত্ক্ষণিক অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধাটির ফলে আরো বেশি মানুষকে ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে বীমাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আশা করছে, যা ফলে তাদের ব্যাংকাস্যুরেন্সের প্রতিও উদ্বুদ্ধ করছে।

একটি সফল সমন্বিত বিপণন মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে ব্যাংকাস্যুরেন্স
বিকাশমান এশিয়ান বাজারগুলো দীর্ঘদিন যাবৎ ব্যাংকাস্যুরেন্সের সুবিধাগুলোকে কাজে লাগাচ্ছে। ব্যাংকাস্যুরেন্স এশিয়ার একটি দ্রুত বর্ধমান ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল এবং অনুমান করা হচ্ছে যে সামনের দিনগুলোতেও ব্যাংকাস্যুরেন্সে এশিয়ায় বীমা খাতের একটি অন্যতম জনপ্রিয় বিপণন মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হবে। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো এশিয়ার মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বীমা খাতের বিক্রয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ হয় ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে, যা জিডিপিতে বীমাশিল্পের অবদান ৩ শতাংশে পৌঁছে দিয়েছে। ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন অব ভিয়েতনামের প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, ব্যাংকাস্যুরেন্স থেকে অর্জিত প্রিমিয়াম মোট জীবন বীমা থেকে অর্জিত প্রিমিয়ামের প্রায় ৩০ শতাংশ, যা ২০১৬ সাল থেকে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া ম্যাককিনজির একটি প্রতিবেদনে অনুমান করা হয় যে ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ব্যাংকাস্যুরেন্স খাতে প্রায় ৪০ শতাংশ কম্পাউন্ড অ্যানুয়াল গ্রোথ রেট (সিএজিআর) বৃদ্ধি পাবে।

এর পরও একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে ব্যাংকাস্যুরেন্স চ্যানেলের এসব সুবিধার ফলে কি বীমার প্রচলিত বিপণনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হবে? জীবন বীমা একটি অত্যন্ত সুচিন্তিত ক্রয় এবং গ্রাহকরা এখনো তাদের সঠিক সুরক্ষা অনুসন্ধানের জন্য এবং তাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে আলোচনা করার জন্য পরামর্শক/এজেন্টের সঙ্গে কাজ করতে পছন্দ করেন। তাই আর্থিক সহযোগী বা এজেন্টের ভূমিকা এখনকার মতোই থাকবে। বলা যায় যে ব্যাংকাস্যুরেন্স গ্রাহকদের জন্য বীমা পণ্যগুলো আরো সহজে পেতে নতুন একটি ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলের সূচনা করবে।

ব্যাংকাস্যুরেন্স গ্রাহকদের সামগ্রিক অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করবে
উন্নততর গ্রাহক অভিজ্ঞতা প্রদানে সক্ষম হয়ে ওঠা হচ্ছে একটি সফল ব্যাংকাস্যুরেন্স পার্টনারশিপের মূল উদ্দেশ্য। ব্যাংকাস্যুরেন্স গ্রাহক অভিজ্ঞতা কখনো জটিল বলে মনে হতে পারে, কেননা প্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া এবং আইটি সিস্টেমে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কাছে আরো আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদানকে অগ্রাধিকার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ একাধিক আর্থিক সেবা প্রদানের জন্য ব্যাংকগুলোর ওয়ান স্টপ শপের সুবিধা রয়েছে, এর পাশাপাশি ব্যাংকের অংশীদারি যদি এমন বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে থাকে, যারা গ্রাহকদের প্রয়োজন বুঝে সেবা দেবে, তবে তা গ্রাহক অভিজ্ঞতাকে আরো সমৃদ্ধ করবে।

সফল পার্টনারশিপের জন্য প্রয়োজন গ্রাহককেন্দ্রিক পণ্য ও সেবা, নিরবচ্ছিন্ন প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম এবং সেই সঙ্গে গ্রাহকদের সেরা অভিজ্ঞতা প্রদানের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টার সমন্বয়। সামগ্রিকভাবে গ্রাহকের প্রয়োজনীয়তা বোঝার ও সমাধানের জন্য ব্যাংক এবং বীমা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের চুক্তিসমূহ আরো ফলপ্রসূভাবে কাজে লাগানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

ব্যাংকাস্যুরেন্স বাংলাদেশের বীমা সেবা বিস্তারে সহায়তা করবে
বাংলাদেশের বীমাশিল্পের একটি উদ্বেগকে মোকাবেলা করার সক্ষমতা রয়েছে ব্যাংকাস্যুরেন্সের, আর এই উদ্বেগটি হচ্ছে—বৃহত্তর অর্থনৈতিক বিকাশের স্বার্থে কিভাবে দেশের বেশির ভাগ মানুষকে জীবন বীমা সুরক্ষার অন্তর্ভুক্ত করা যায়। একটি কার্যকর নির্দেশিকা বাস্তবায়ন করে, ব্যাংকিং (বাংলাদেশ ব্যাংক) এবং বীমা ক্ষেত্রের (আইডিআরএ) উভয় নিয়ন্ত্রকই বীমাগ্রহীতার সংখ্যা আরো বাড়িয়ে তুলতে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে আরো জোরালো করতে, বীমা খাতকে আরো বর্ধিত করে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার জন্য নেওয়া উদ্যোগগুলোকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করতে পারে। কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবে মানুষ এখন স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত ঘটনার আশঙ্কায় অতিরিক্ত আর্থিক সুরক্ষা পেতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, এই সময়ে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখকঃ মুহাম্মাদ আসিফ সামছ, পরিচালক, ব্যাংকাস্যুরেন্স, মেটলাইফ বাংলাদেশ।

আরও দেখুন:
◾ বিদেশে টাকা পাঠানো সহজ করলো বাংলাদেশ ব্যাংক
 ৫ ব্যাংক সরকারি কর্মকর্তাদের গৃহঋণে যুক্ত হলো
 কেন্দ্রীয় ব্যাংক কৃষি ঋণ পরিশোধের শর্ত শিথিল করলো
 ব্যাংকিং পেশায় কর্পোরেট সংস্কৃতি

Leave a Reply