তারল্য বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের করণীয়

0

কভিড-১৯-এর মহামারীতে বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে। বৈশ্বিক সরবরাহ নিগড় (গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন) ভেঙে পড়ায় বিভিন্ন দেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে কার্যত বিচ্ছিন্ন। পরিবহন নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ছে। মানুষ নিজেদের ঘরে বন্দি হওয়ায় শ্রম চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তারল্য সংকটের কারণে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনিশ্চয়তা বাড়ছে। যেহেতু কভিড-১৯-এ সংক্রমণ বাড়ছে, সেহেতু পড়তি চাহিদাও ভেঙে পড়া সরবরাহ নিগড়ের মুখোমুখি হওয়া ব্যবসাপ্র্রতিষ্ঠানগুলো সামনে কর্মীদের কর্মচ্যুত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প খুঁজে পাবে না।

অবশ্য সেটি হবে অস্থিতিশীলকর এবং গোলমেলে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রণোদনার মাধ্যমে বাংলাদেশকে অবশ্যই এই পরিণাম এড়াতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়া বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং আমাদের আর্থিক ব্যবস্থায় তারল্য সংকট বিরাজ করায় যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য উন্নত দেশগুলো এখন যা করছে, তাদের মতো আমরা বাজেটারি সাপোর্টের বড় সুযোগ সরকারের কাছ থেকে আশা করি না। উত্তম পদক্ষেপ হবে যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেন রেপো রেট ২ শতাংশ হ্রাস করে ৪ শতাংশ এবং ঋণের ওপর সুদের হার ৫-৮ শতাংশের লক্ষ্য অর্জনে ব্যাপক সম্প্রসারণশীল মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করে।

এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক তাত্ক্ষণিকভাবে প্রাইমারি ডিলারদের ধারণকৃত সরকারি বন্ড ও ট্রেজারি বিল বাট্রায় ক্রয় শুরু করতে পারে এবং তাদের কাছে ৯০ দিন ম্যাচুরিটিসম্পন্ন টার্ম ফান্ডিং অফার করতে পারে। অবস্থা আরো বেগতিক হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে এ সুবিধা বাড়াতে অবশ্যই প্রস্তুত থাকতে হবে। এই সুবিধার অধীনে প্রাইমারি ডিলারদের কাছে দেয়া সম্প্র্রসারিত ঋণ বিভিন্ন ধরনের সিকিউরিটি দ্বারা বন্ধকীকৃত হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আরোপিত সুদহারই হবে প্রাইমারি ক্রেডিট রেট বা ডিসকাউন্ট রেট। উল্লেখ করা দরকার, ফেড ওপেন মার্কেট অপারেশন পরিচালনা করছে এবং ফেডারেল ফান্ড রেট শূন্য এক-চতুর্থাংশ টার্গেট মাত্রার মধ্যে বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।

বাংলাদেশ ব্যাংককে এটি অবশ্যই পরিষ্কার করতে হবে যে টার্গেট প্রাইমারি রেট অর্জন না করা পর্যন্ত সংস্থাটিকে সরকারি সিকিউরিটিজ ও বিল কেনা অব্যাহত রাখতে হবে। অন্য নীতি অপশনের মধ্যে রয়েছে নগদ সঞ্চিতির শর্ত (সিআরআর) ও স্ট্যাটিউটরি লিকুইডিটি হার (এসএলআরএস) কমানো। টার্গেট মাত্রা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ অর্থ বেশি থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে তাদের ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) বাড়াতে নির্দেশনা প্রদান করতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত রেপো হার বর্তমান ৬ থেকে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে নিলাম করা ট্রেজারি বিলের কাট অফ ইল্ড অবশ্য দেখা গেছে ৭ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে। এটি অর্থনীতির কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মোটেই সংগতিপূর্ণ নয়। এটি আরো নির্দেশ করে যে বাংলাদেশ ব্যাংক বাস্তবতা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। তারল্য দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অর্থবাজার চাঙ্গা করা দরকার, যাতে সুদহার কমে এবং দ্রুত ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রদান বাড়ানো যায়।

করোনাভাইরাসের মহামারী দ্বারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পগুলোকে টার্গেট করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরো কিছু নীতি হস্তক্ষেপ করতে পারে। একটি প্রধান নীতিনির্দেশনা হতে পারে সহজ শর্তে শিল্পগুলোকে ন্যূনতম হারে ব্রিজ লোন প্রদান করা, কাজ থাকুক বা না থাকুক তারা যেন নিজেদের কর্মীদের অন্তত তিন মাসের বেতন দিতে পারে। আমার ধারণা, এ সময়ের মধ্যে করোনাভাইরাসের কার্যকর ওষুধ বা টিকা চলে আসবে এবং সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

যুক্তরাজ্যের ট্রেজারি এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ‘কভিড করপোরেট ফিন্যান্সিং ফ্যাসিলিটি (সিসিএফএফ)’ নামে একটি ঋণদান সুবিধা প্রবর্তন করেছে। সিসিএফএফ বড় বড় প্রতিষ্ঠানে তারল্য পৃষ্ঠপোষকতা জোগাতে, কমার্শিয়াল পেপার কেনার মাধ্যমে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময়ে তাদের নগদ প্রবাহ অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে খানা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণপ্রবাহ জোগাতে ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ড কমার্শিয়াল পেপার ফান্ডিং ফ্যাসিলিটি (সিপিএফএফ) প্রবর্তন করেছে। করপোরেট ইস্যুয়ারদের কাছ থেকে সরাসরিভাবে যোগ্য করপোরেট ডেট কিনতে ইউএস ফেড একটি স্পেশাল পারপাস ভেহিকলও (এসপিভি) প্রবর্তন করেছে।

সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) ধরনের যোগ্য ইনডিভিজুয়াল করপোরেট বন্ড এবং যোগ্য করপোরেট বন্ড পোর্টফোলিও কিনতে আরো একটি এসপিভি চালু করেছে। সুনির্দিষ্ট শর্ত পূরণসাপেক্ষে সরাসরিভাবে করপোরেট ডেট সিকিউরিটিজ কিনতে উত্সাহিতকরণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকও একই ধরনের স্পেশাল পারপাস ভেহিকল (এসপিভি) চালু করতে পারে। এই এসপিভি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করপোরেট বন্ডেও বিনিয়োগ হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্বব্যাংক, আইডিবি ও আইএমএফসহ বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে এবং এ উদ্দেশ্যে ১ লাখ কোটি টাকা সমমূল্যের একটি স্পেশাল পারপাস ভেহিকল চালু (ফ্লোট) করতে পারে। সর্বোচ্চ ঋণমানসম্পন্ন ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই নিম্ন ব্যয়ের তহবিল পেতে পারে এবং লোকবল নিয়োগ ও তাদের বেতন অব্যাহত রাখাসহ কিছু শর্ত পূরণসাপেক্ষে সরাসরিভাবে ব্যবসায়ীগোষ্ঠীকে ঋণ প্রদান শুরু করতে পারে। কিছু ঋণমান সংস্থা বাংলাদেশে কাজ করে।

অবশ্য তাদের ঋণমান বিশ্বাসযোগ্য নয়। দেনাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সামর্থ্য ও মুনাফাযোগ্যতা মূল্যায়নে একটি বিকল্প প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এ প্রক্রিয়া করোনাভাইরাসের অভিঘাতের আগে আর্থিকভাবে ভালো থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ঋণপ্রবাহ জোগানোর ক্ষেত্রে সুরক্ষা দেবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্যে ঋণের ক্ষেত্রে ১২ মাস কিস্তি প্রদান করা হতে অব্যাহতির (মরাটরিয়াম) একটি নির্দেশনা জারি করতে পারে। এটি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাত্ক্ষণিক দেউলিয়াত্ব এড়াতে সুরক্ষাকবচ বা ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

ইউকে ট্রেজারি তার ২০২০ বাজেটে ‘করোনাভাইরাস বিজনেস ইনটারাপশন লোন স্কিম’ (সিবিআইএলএস) ঘোষণা করেছে এবং একটি ব্রিটিশ ব্যাংক যুক্তরাজ্যের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এই কর্মসূচি অনাদায়ী স্থিতির বিপরীতে ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার সমর্থিত গ্যারান্টি দেয়। দেশটির সরকার সুদ পরিশোধের প্রথম মাসের কিস্তি নিজেই কাভার করবে, যাতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিম্ন সুদ পরিশোধ থেকে সুফল পায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো মূলধনের পুনঃপরিশোধের জন্য দায়ী থাকবে। এ কর্মসূচির অধীনে সর্বোচ্চ সুবিধা হবে ৫ মিলিয়ন পাউন্ডের সমমূল্যের। সিবিআইএলএস টার্ম ফ্যাসিলিটি, ওভারড্রাফট, ইনভয়েস ফিন্যান্স ফ্যাসিলিটি, অ্যাসেট ফিন্যান্স ফ্যাসিলিটিসহ বিভিন্ন ধরনের বিজনেস ফিন্যান্স প্রজেক্টকে পৃষ্ঠপোষকতা জোগায়।

এ কর্মসূচির উপযুক্ততা শর্তের মধ্যে রয়েছে বার্ষিক ৪৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি টার্নওভার নেই এমন প্রতিষ্ঠান হতে হবে, ওই প্রতিষ্ঠানকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী হতে হবে এবং ঋণদাতাদের স্বাভাবিক ঋণ শর্ত পূরণে অসমর্থ হতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই সিবিআইএলএস স্কিমকে অনুসরণ করতে পারে এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে অনুরূপ স্কিম চালু করতে পারে। সুনির্দিষ্ট আরেকটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। তা হলো, ২০০ জনের কম কর্মী নিয়োজিত এবং বার্ষিক ৫০ কোটি টাকার কম টার্নওভারের অতি ছোট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের (এসএমই) জন্য ঋণদান সুবিধা সহজলভ্য করা।

খানা এবং অতি ছোট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোয় তারল্য জোগানো একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক মাইক্রোফিন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফআই) সঙ্গে কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো খুব নিম্ন সুদে এমএসএমই এবং নিম্ন আয় ও নাজুক খানাগুলোয় এই নতুন অর্থ নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা। এমএফআইগুলোর বিরুদ্ধে প্রায়ই ক্ষুদ্রঋণের জন্য নিম্ন সুদহারের সরকারের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করার অভিযোগ বিদ্যমান। এটি প্রশমন করতে হবে।

দেশব্যাপী বিস্তৃত রাষ্ট্রায়ত্ত ও ব্যক্তি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নেটওয়ার্কও খানা এবং এমএসএমইগুলো সাশ্রয়ী ব্যয়ে ঋণ পৌঁছে দেয়ায় ব্যবহার হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ব্র্যাক ব্যাংকের এমএসএমইগুলোর ঋণের বড় বড় পোর্টফোলিও সামলানোর অভিজ্ঞতা আছে। পিকেএসএফের দেশব্যাপী অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়েও এ ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তাদের অভিজ্ঞতা ও অবকাঠামো সুন্দরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

এদিকে জনস্বাস্থ্যে সহযোগিতা এবং এই মহামারীতে খানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সাহায্য করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় তাদের রাজস্ব ও বাজেটারি সাপোর্ট পুনর্বিবেচনা করা উচিত। পুঁজিবাজারেও জরুরি ভিত্তিতে প্রণোদনা জোগানো দরকার। বাংলাদেশ বিপুল বাজেট ঘাটতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। এই ভারসাম্যহীনতা সামলাতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংককে অবশ্যই অর্থায়নের বিকল্প অপশন অন্বেষণ করতে হবে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন অবশ্যই যেকোনো সরকারি উদ্যোগের একটি প্রধান উপাদান হবে।

ড. মিজানুর রহমান
অধ্যাপক
অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply