এজেন্ট ব্যাংকিং

এজেন্ট ব্যাংকিং খুলে দিল সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি একটি অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। বিশ্বের ১৫ বছরের অধিক বয়সী ৩১ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখনো আর্থিক সেবার আওতার বাইরে রয়েছেন। আর বাংলাদেশের ১৬ কোটির বেশি মানুষের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা প্রায় ১১ কোটি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকই প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবার বাইরে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ২০২৪ সালের মধ্যে শতভাগ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে এরই মধ্যে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

কৃষকসহ বিভিন্ন নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব এবং ওই হিসাবধারীদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ও টেকসই করার লক্ষ্যে বিনা জামানতে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান, স্কুল ব্যাংকিং ও পথশিশুদের জন্য ব্যাংক সেবা, এজেন্ট ব্যাংকিং ও ব্যাংকের উপশাখার মাধ্যমে আর্থিক সেবা প্রসারের কাজ চলছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক সেবাপ্রত্যাশী মানুষের জন্য স্বল্পতম সময়ে সহজে ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা, আর্থিক শিক্ষাসহ গ্রাহক স্বার্থরক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।

সব স্তরের জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবার আওতাভুক্ত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম অন্যতম। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও আর্থিক সেবাপ্রত্যাশী জনসাধারণকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে এবং আর্থিক সেবা সহজলভ্য করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে। এজেন্ট ব্যাংকিং ধারণাটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলো শাখা না খুলেও এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ব্যাংকিং সেবা দিতে পারছে। এতে গ্রাহকেরা যেমন একদিকে দ্রুত, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সুবিধা হাতের নাগালে পাচ্ছেন, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও কম পরিচালন ব্যয়ে গ্রাহকসেবা দিতে পারছে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক সেবার পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত এক বছরে এজেন্ট আউটলেট সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ ও গ্রাহক হিসাব সংখ্যা প্রায় ১২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া আমানত ও ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির পরিমাণ যথাক্রমে প্রায় ২০৫ শতাংশ ও ১২৫ শতাংশ। এজেন্ট ব্যাংকিং প্রসারের ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাংক শাখা না থাকা সত্ত্বেও বৈধ পথে রেমিট্যান্স আহরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স বিতরণ করা হয়েছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই পল্লি এলাকায়।

ব্যাংক, ব্যাংকার, ব্যাংকিং, অর্থনীতি ও ফাইন্যান্স বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ খবর, প্রতিবেদন, বিশেষ কলাম, বিনিয়োগ/ লোন, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ফিনটেক, ব্যাংকের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারগুলোর আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ 'ব্যাংকিং নিউজ', ফেসবুক গ্রুপ 'ব্যাংকিং ইনফরমেশন', 'লিংকডইন', 'টেলিগ্রাম চ্যানেল', 'ইন্সটাগ্রাম', 'টুইটার', 'ইউটিউব', 'হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল' এবং 'গুগল নিউজ'-এ যুক্ত হয়ে সাথে থাকুন।

তৃণমূল পর্যায়ে আর্থিক সেবাকে সম্প্রসারিত করার দ্রুততম মাধ্যম হিসেবে এজেন্ট ব্যাংকিং ইতিমধ্যেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দ্রুত বর্ধমান এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে চলেছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতিও উপকৃত হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে আর্থিক সেবা প্রাপ্তির মাধ্যমে তৃণমূল মানুষের মাঝেও সঞ্চয় প্রবণতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় ব্যাংক হিসাবে জমার পাশাপাশি এজেন্ট আউটলেটগুলোর মাধ্যমে ঋণ বিতরণ কর্মসূচি বাড়াতে হবে। এটা সম্ভব হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যবসা ও কর্মসংস্থান তথা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আরও প্রসার ঘটবে। এ ছাড়া প্রবাসী আয় আহরণের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেশজুড়ে, বিশেষ করে পল্লি এলাকার হুন্ডি প্রথা নিরুৎসাহিত করতে এবং সরকার ঘোষিত ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা প্রাপ্তিতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের আয় বাড়ানোর কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করতে হলে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যেই এজেন্টের মাধ্যমে কৃষি ও এসএমই ঋণ বিতরণের নির্দেশনা জারি করেছে এবং ঋণ বিতরণের পরিমাণ আশাব্যঞ্জক হারে বাড়ছে। বর্তমানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা আর্থিক সেবা গ্রহণে পুরুষের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছেন।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নারীদের আর্থিক সেবা গ্রহণে উৎসাহিত করা হলে তা নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি দেশে লিঙ্গবৈষম্যও অনেকাংশে কমে আসবে। সার্বিক বিবেচনায় এজেন্ট ব্যাংকিং বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমে একটি নব উদ্যম ও গতিশীলতা এনেছে। এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমকে পুরোপুরি সফল করতে হলে উপযুক্ত এজেন্ট নিয়োগ ও আউটলেট পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে ব্যাংকগুলোকে।

লেখক: আনোয়ারুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রিলেটেড লেখা

Back to top button