এজেন্ট ব্যাংকিং

ব্যবসা হিসাবে এজেন্ট ব্যাংকিং

নতুন না হলেও এজেন্ট ব্যাংকিং (Agent Banking) ব্যবসার ধারণাটি এখনো খুব বেশি পরিষ্কার নয়। ব্যাংক কর্তৃক নিয়োগকৃত এজেন্টের মাধ্যমে ব্যাংকের শাখা নেই এমন এলাকায় সীমিত আকারে যাবতীয় ব্যাংকিং সেবা প্রদান করাই হল এজেন্ট ব্যাংকিং (“Agent Banking” means the business of providing banking services through agent’s network.)। মোবাইল ব্যাংকিং আর এজেন্ট ব্যাংকিং এর মধ্যে মুল পার্থক্যটা হলো- মোবাইল ব্যাংকিং শুধু মাত্র টাকা আদান প্রদানের একটা মাধ্যম আর এজেন্ট ব্যাংকিং হলো পরিপূর্ণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করা সম্পূর্ণ নতুন এই ব্যবসার ধরনটি গতানুগতিক অন্যান্য ব্যবসার থেকে একটু আলাদা। সবাইকে দিয়ে এই ব্যবসা সম্ভব নয়।

প্রথমেই আসা যাক কারা ব্যাংকিং এজেন্ট হতে পারবেন
এজেন্ট ব্যাংকিং এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রণীত প্রুডেনশিয়াল গাইড লাইন ফর এজেন্ট ব্যাংকিং-২০১৭ (Prudential Guidelines for Agent Banking Operation in Bangladesh-2017) হল সর্বশেষ সার্কুলার। সেখানে কারা এজেন্ট হিসাবে আবেদন করতে পারবেন তার একটি দিক নির্দেশনা পরিষ্কার করে বলা আছে। সার্কুলারটির মুগদা কথা হলো- সমাজে প্রতিষ্ঠিত এক বা একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যে বা যারা কিনা ঋণ খেলাপি নয় এবং আইনের চোখে কোন ফৌজদারি মামলার আসামী বা সাজাপ্রাপ্ত নয়, গ্রাহক সেবা দানে সক্ষম ও প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পূর্ণ যে কেউ এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট খোলার জন্য সুবিধা মত ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন।

স্থান নির্বাচন করবেন কিভাবে?
প্রথম দিকে এজেন্ট আউটলেট শুধু গ্রামেই খোলা যেত। এখন শহরেও আউটলেট খোলার অনুমতি দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সে হিসাবে আপনার সুবিধামত একটি স্থান নির্বাচন করতে পারেন। বিশেষ করে খেয়াল রাখা দরকার যে এলাকায় বা বাজারে এখনও কোন ব্যাংকের শাখা বা উপশাখা বা এজেন্ট শাখা নেই সেই স্থানটিকে বেছে নিতে পারেন। বাজারের সাইজ ও জনসংখ্যার উপর ভিত্তি করে দু একটি এজেন্ট শাখা থাকলেও আপনার ব্যবসার প্রসারে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। কারন ব্যাংক ভেদে প্রোডাক্ট ও সেবার ধরন আলাদা হয়। সেক্ষেত্রে আপনি যে ব্যাংকটির এজেন্ট নিচ্ছেন তার ইমেজ ও প্রোডাক্ট সমৃদ্ধির উপর নির্ভর করবে আপনার ব্যবসায়িক উন্নতি ও অগ্রগতি। আউটলেটটি যাতে দৃশ্যমান জায়গায় হয় সে ব্যাপারটি অবশ্যই মাথায় রাখবেন। সাধারনত ব্যাংকের শাখাগুলো যেমন জায়গায় হয় সে রকম না হলেও তার কাছাকাছি একটি জায়গা নির্বাচন করবেন। এ ব্যাপারে ব্যাংকগুলোই আপনাকে যথাযত সহায়তা করবেন।

কত টাকা বিনিয়োগ করবেন?
এক কথায় ব্যাংকিং ব্যবসা হলো টাকা কেনা বেচার দোকান। এখানে প্রোডাক্ট হলো টাকা। সুতরাং আপনাকে টাকা বিনিয়োগ করতেই হচ্ছে। প্রশ্ন হলো কত টাকা বিনিয়োগ করবেন? এজেন্ট ব্যবসায় আপনি এক ধাপ এগিয়ে থাকবেন যদি আপনার নিজস্ব ২০০ থেকে ৫০০ স্কয়ার ফিট দোকান থাকে। নয়তো ভাড়া হিসাবে সেখানে এককালিন একটা খরচ করতে হবে। এর পর আসি ডেকোরেশানে, ডেকোরেশানের ব্যবস্থা কিছুটা ব্যাংক করে দেয় আবার কিছু কিছু নিজেকে করে নিতে হয়। সেক্ষেত্রে আপনি যে ব্যাংকের এজেন্ট নিচ্ছেন তাদের কাছে বিস্তারিত জেনে নিবেন।

ব্যাংক, ব্যাংকার, ব্যাংকিং, অর্থনীতি ও ফাইন্যান্স বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ খবর, প্রতিবেদন, বিশেষ কলাম, বিনিয়োগ/ লোন, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ফিনটেক, ব্যাংকের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারগুলোর আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ 'ব্যাংকিং নিউজ', ফেসবুক গ্রুপ 'ব্যাংকিং ইনফরমেশন', 'লিংকডইন', 'টেলিগ্রাম চ্যানেল', 'ইন্সটাগ্রাম', 'টুইটার', 'ইউটিউব', 'হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল' এবং 'গুগল নিউজ'-এ যুক্ত হয়ে সাথে থাকুন।

জামানতের ব্যাপারে বলি, সাধারনত ব্যাংকগুলো খুব বেশি জামানত নেয় না দুই থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা জামানতেই এজেন্ট নিতে পারবেন। এটি আপনার এককালীন বিনিয়োগ। তার পর আছে স্টাফদের বেতন। কোন কোন ব্যাংক প্রতিটি আউটলেটে দু এক জন অফিসার দিয়ে থাকেন। তাছাড়াও নুন্যতম ২ জন আপনার নিজস্ব লোক আউটলেটে রাখতেই হবে। তাদের মাসিক বেতন হিসাবে যা খরচ হবে সেটি আপনাকেই বহন করতে হবে। সর্বশেষ হল দৈনিক লেনদেনের জন্য চলমান বিনিয়োগ। সেটি পুরোপুরি নির্ভর করবে গ্রাহকের লেনদেনের উপর। মোটামুটি ১০ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা ছাড়া এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবসা ভালোভাবে চালানো সম্ভব নয়। চাহিদামত গ্রাহকের টাকা জমা বা উত্তোলনের ক্ষেত্রে নগদ টাকা যেমন দরকার একই ভাবে আপনার মাস্টার একাউন্টে ব্যালেন্স থাকাটাও দরকার। মনে রাখতে হবে একটি বারের জন্যও যেন কোন গ্রাহক আপনার আউটলেট থেকে ফেরত না যান। তাতে করে একটা বিরূপ ধারণা তৈরি হয়।

ব্যাংক নির্বাচন
বাংলাদেশে সরকারি বেসরকারি মিলে প্রায় ২৪টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং লাইসেন্স নিয়েছেন। তার মধ্যে প্রায় ১৯টি ব্যাংক বর্তমানে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্য ব্যাংক গুলোও কার্যক্রম শুরু করার অপেক্ষায় আছে। ব্যাংক নির্বাচনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারন এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যাবসায় লাভবান হওয়াটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। একটি ভাল ব্যাংকের সাথে ব্যাবসা শুরু করতে পারলে ব্যাবসার উন্নয়নে আপনি এক ধাপ এগিয়ে থাকবেন। টাকা জিনিসটা অন্যরকম।

সারা জীবনের ঘাম ঝরানো ইনকামের সম্বল না জেনে না বুঝে যেখানে সেখানে আমানত করতে চায় না। বিশেষ করে কিছু এন জি ও কোম্পানি, বীমা কম্পানি সহ নানান হায় হায় কোম্পানি গ্রামের সহজ সরল মানুষকে সর্বস্বান্ত করার খবর কারো অজানা নয়। সেক্ষেত্রে ব্যাংকের বয়স, ব্রাড ইমেজ, পরিচালনায় কারা আছেন, নিকটস্থ শাখা থেকে আপনার এলাকার দূরত্ব এই বিষয়গুলো ভালো করে খোঁজ খবর নিতে পারেন। মনে রাখবেন একটি ব্যাংকের এজেন্ট নিলে আপনি আর অন্য কোন ব্যাংকের এজেন্ট নিতে পারবেন না।

আসল আলোচনা মুনাফা
এখন কথা হলো আপনি কতদিনে লাভের মুখ দেখবেন। ব্যাংকগুলোর কমিশন আপাতদৃষ্টিতে খুব কম মনে হলেও গ্রাহক সংখ্যা যত বাড়বে ততই দ্রুত আপনি লাভের মুখ দেখতে পারবেন। প্রথম দিকে একাউন্ট খোলার কমিশন, ইউটিলিটি বিলের কমিশন, ইএফটিএন, আরটিজিএস বা গ্রাহকের টাকা জমা ও উত্তোলন থেকে প্রাপ্ত কমিশন দিয়েই আপনাকে চালিয়ে নিতে হবে। আস্তে আস্তে আমানত সংগ্রহের পরিমাণ বাড়াতে পারলে ১২ থেকে ১৬ মাসের মধ্যেই মুনাফা আসতে শুরু করবে।

দ্রুত ব্রেক ইভেনে আসতে চাইলে অবশ্যই আপনাকে আমানত সংগ্রহে মনোনিবেশ করতে হবে। গ্রাহকের আমানত থেকে প্রাপ্ত কমিশনই আপনার মুল আয়ের উৎস। সে জন্য সব সময় মাথায় রাখতে হবে স্কিম ডিপোজিট একাউন্ট বাড়ানোর ব্যাপারটি। কারন স্কিম ডিপোজিট একাউন্টে ডিপোজিট যেমন আস্তে আস্তে বাড়ে তেমনি আস্তে আস্তে কমে। ফলে হুট হাট করে ডিপোজিট কমে গিয়ে কমিশন প্রাপ্তিতে প্রভাব পড়ে না।

প্রচারেই প্রসার
হ্যাঁ, ব্যপারটা একদমই সঠিক। প্রচারনা চালাতে হবে জোরালোভাবে। মানুষের কাছে খবর যত দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারবেন ততই প্রসার হবে ব্যবসার। নিজ উদ্যোগে এলাকায় মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, বাড়ি বাড়ি প্রতিনিধি প্রেরণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোষ্ট শেয়ার সহ নানামুখি কার্যকলাপের মাধ্যমে জানান দিতে হবে আপনি কি কি সেবা দিচ্ছেন।

যে সব ভুল করবেন না
আমানতের খেয়ানত করা অনেক বড় গুনাহের কাজ। ভুলেও গ্রাহকের টাকাকে আপনার টাকা হিসেবে চিন্তা করবেন না। কোন অবস্থাতেই গ্রাহক হয়রানি করবেন না। আপনার এজেন্ট আউটলেটে অন্য কোন ব্যবসা বা পন্য রাখবেন না। আউটলেটে সব সময় একটি ব্যাংকিং পরিবেশ বজায় রাখবেন। নির্দিষ্ট সময় আউটলেট খোলা ও বন্ধ করার ব্যপারে অধিক মনোনিবেশ করবেন। আপনার কর্মীদের আচার-আচরন, জামা কাপড় ইত্যাদি ছোট ছোট ব্যাপারগুলো গুরুত্ব দিয়ে খেয়াল রাখবেন। আউটলেটের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখবেন। দিন শেষে অতিরিক্ত টাকা আউটলেটে রাখবেন না। প্রয়োজনে ব্যাংকিং আওয়ারেই ব্যাংকে জমা করে দিন।

শেষ কথা
এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবসা দ্রুতই প্রসারিত হচ্ছে। গাহক আমানতের পরিমাণ অকল্পনিওভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যাংকগুলো স্বল্প খরচে মোটা অংকের আমানত সংগ্রহ করতে পাচ্ছে বলে সবাই এই ব্যবসার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে। আগামি দিনে শাখা খোলার পরিবর্তে গ্রামে গঞ্জে এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমেই পরিচালিত হবে ব্যাংকিং ব্যবস্থা। সে ক্ষেত্রে সেই ব্যাংক এগিয়ে থাকবে যারা সেবার মান ধরে রাখতে পারবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল ব্যবহার করে সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে গেলে খুব দ্রুতই দেশের আনাচে কানাচে এই সেবার দ্বার উন্মুক্ত করা সম্ভব।

লেখকঃ মোঃ আরাফাত হোসাইন
মধুমতি ব্যাংক লিমিটেড
নওগাঁ শাখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রিলেটেড লেখা

Back to top button