ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম একটি পর্যালোচনা

0
492

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ প্রতি ঋণগ্রহীতাকে ১,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত প্রদত্ত জামানতবিহীন স্বল্পপরিমাণ ঋণ। এ ঋণ প্রধানত কর্মসংস্থান ও আয় সৃষ্টিকারী কার্যক্রম আরম্ভ করার উদ্দেশ্যে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা তজ্জাতীয় কর্মসূচি এবং ব্যাংক ও প্রচলিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা আধা একরের চেয়ে কম জমির মালিক তাদেরকে প্রদান করা হয়। ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ (এমএফআই) দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ঋণ অর্থসংস্থানের বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের আয় ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে। দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিসমূহ প্রধানত পল্লী এলাকায় বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক ভারসাম্যহীনতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অপসারণের উদ্দেশ্যে ব্যাপক সংখ্যক ঋণ গ্রহীতাকে এর আওতায় নিয়ে আসে।

গ্রামের দরিদ্র জনগণ দীর্ঘদিন ধরে অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ওপর অধিক মাত্রায় নির্ভরশীল ছিল। গ্রামীণ ব্যাংক বাংলাদেশে বিকল্প ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালু করে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে দরিদ্র মহিলাদের মধ্যে গোষ্ঠীভিত্তিক ঋণ প্রদানের একটি কর্মসূচি হিসেবে প্রথমে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম আরম্ভ হয়। গ্রামীণ ব্যাংক ১৯৭৬ সালে একটি পরীক্ষামূলক ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প চালু করে। বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) এবং কর্মসংস্থান ব্যাংক-এর মতো বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ৮০০-এর অধিক এনজিও দেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। গ্রামীণ ব্যাংকের গোষ্ঠীভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ অর্থায়ন প্রকল্পের সাফল্য এবং গ্রামীণ মডেলে পরিচালনাধীন বহুসংখ্যক এমএফআই বিশ্বব্যাপী প্রশংসা অর্জন করেছে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ৪৫টিরও বেশি দেশে এ মডেলটি অনুসৃত হচ্ছে। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ভূমিহীন পরিবারভিত্তিক যুবগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থান এবং আয় সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্দেশ্যে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের লক্ষ্যে একটি ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প গ্রহণ করে। ২০০০ সালে বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ৯ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে এবং তাদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই রয়েছে ৫ মিলিয়নেরও বেশি।

অবশ্য, বাংলাদেশ বা বহির্বিশ্বে ক্ষুদ্রঋণ নতুন কোনো বিষয় নয়। টাকা ধার প্রদানকারী বা মহাজন, অবস্থাপন্ন প্রতিবেশী এবং আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবের মতো প্রাতিষ্ঠানিক স্থানীয় উৎস থেকে স্মরণাতীতকাল থেকে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের ব্যবস্থা চালু ছিল এবং এ ধরনের লেনদেনের নজির বৈদিক ভারতেও পাওয়া যায়। মূলত প্রাতিষ্ঠানিক পল্লী-ঋণ প্রদানকারী সংস্থার অনুপস্থিতির কারণে অর্থ ধার দেওয়ার এ প্রাচীন রীতি সমগ্র মুগল শাসনামলে প্রচলিত ছিল, এমনকি তা ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিকেও সক্রিয় ছিল। সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে লোন অফিস এবং ব্যাংক-এর মতো প্রাতিষ্ঠানিক উৎস শুরু হওয়ার পূর্বপর্যন্ত অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণদাতাদের কার্যক্রমের প্রসার অব্যাহত থাকে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক উৎসসমূহ কর্তৃক সরবরাহের তুলনায় অর্থের জন্য চাহিদা সব সময়ই বেশি থাকত এবং পল্লী ও নগর উভয় এলাকার অধিকাংশ দরিদ্র মানুষের সহজে আনুষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার সুযোগ না থাকায় নতুন গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ-উৎসসমূহ পূর্বতন অনানুষ্ঠানিক উৎসগুলিকে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারে নি।

পাকিস্তান আমলে একটি বাদে সবগুলি ব্যাংকই ছিল বেসরকারি মালিকানাধীন। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে স্বল্প আয়ের লোকজন খুব কম ক্ষেত্রেই ব্যাংক ঋণ পেত। তখন ২২টি পরিবার ব্যাংকিংসহ দেশের সব ব্যবসাবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত।

এ সকল সমস্যা পরবর্তীকালে বড় ধরনের গণঅসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে এ আশঙ্কায় সরকার ১৯৬০-এর শেষের দিকে কিছু ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালু করে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, পাট ব্যবসায় অর্থসংস্থানের জন্য ফড়িয়া-ব্যাপারী প্রকল্প এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প। প্রথম প্রকল্পের অধীনে ফড়িয়া এবং ব্যাপারীর মতো পাট ব্যবসায়ের খুচরা ব্যবসায়ীদেরকে তফশিলভুক্ত ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ দেওয়া হতো এবং ঋণের সীমা ছিল ফড়িয়াদের জন্য ১,০০০ টাকা এবং ব্যাপারীদের জন্য ২,০০০ টাকা। এ ঋণগুলি ছিল জামানতবিহীন, কিন্তু নিরাপত্তা হিসেবে ব্যাংকে ব্যবসায়ের লাইসেন্স জমা দিতে হতো। দ্বিতীয় প্রকল্পের অধীনে ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান তফশিলভুক্ত ব্যাংকসমূহকে তাদের নিজস্ব ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প চালু করার উপদেশ দেয়। এ ধরনের চালু কয়েকটি প্রকল্পের মধ্যে ছিল ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের ‘পিপলস ক্রেডিট’ (ঋণ-সীমা ২,০০০ টাকা), হাবিব ব্যাংক লিমিটেড-এর ‘শপ-কিপার্স লোন স্কিম’ (সীমা ১,০০০ টাকা) এবং ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেড- এর ‘স্মল লোন স্কিম’ (সীমা ১,০০০ টাকা)। এ সকল কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয় কারণ অসৎ ব্যাংক কর্মকর্তারা ভূয়া নামে বড় ব্যবসায়ী এবং ফড়িয়া, ব্যাপারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণ প্রদান করে। এ কাজে জড়িতদের অসাধুতা এবং কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রক আইনের অনুপস্থিতি ক্ষুদ্রঋণের এ ব্যর্থতাকে আরও দ্রুত ও প্রবল করে।

১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার পর, সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সকল তফশিলভুক্ত ব্যাংক জাতীয়করণ করে এবং গণমুখী ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে গ্রামের দরিদ্র মানুষদের সঞ্চয় ও ক্ষুদ্রঋণ সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে পল্লী এলাকায় ব্যাংকের শাখা প্রতিষ্ঠা করে। ছোট আকারে কৃষিঋণ বিতরণের মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) এবং পরবর্তীকালে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) প্রতিষ্ঠা করে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ (এনসিবি), বিকেবি এবং রাকাবের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত থাকলেও বিধি-বিধানের কড়াকড়ি তাদের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে অদক্ষ করে তোলে। এরপরও তারা সম্মিলিতভাবে জুন ২০০০ পর্যন্ত ১,৭৯৮.৪৫ মিলিয়ন টাকা ক্ষুদ্রঋণ হিসেবে বিতরণ করেছিল।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে, স্বপ্রণোদিত হয়ে বহু স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠী মুক্তিযোদ্ধা এবং শরণার্থীদের খাদ্য, বস্ত্র ও নৈতিক সমর্থন প্রদানের মাধ্যমে সাহায্য করে। এ সকল গোষ্ঠীর কয়েকটি পরবর্তীতে দেশে তাদের পুনর্বাসন ও মানবসেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখে এবং অল্প দিনের মধ্যেই গোষ্ঠীগুলি সমাজকল্যাণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যাভিসারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তারা বেসরকারি সংগঠন (এনজিও) নামে পরিচিত হয়ে ওঠে এবং পর্যায়ক্রমে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, সাক্ষরতা প্রসার, স্বাস্থ্য-সচেতনতা বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের মাধ্যমে স্বকর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারন করে। ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী থানার জোবরা গ্রামে গ্রামীণ ব্যাংক একটি প্রকল্প হিসেবে কাজ শুরু করে। এটিকে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ক্ষুদ্রঋণ সম্পর্কিত একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পে রূপান্তর করা হয়। গ্রামীণ ব্যাংক আইন ১৯৮৩-এর অধীনে ১৯৮৩ সালে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত ব্যাংক-এ পরিণত করা হয়।

গ্রামীণ ব্যাংক আয় বৃদ্ধি এবং সম্পদ সৃষ্টিমূলক কার্যক্রমের লক্ষ্যে একটি বড় জনগোষ্ঠীকে জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করে থাকে। এটি এর সদস্যগণকে গৃহনির্মাণ ঋণও প্রদান করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এ ব্যাংকটির ঋণ বিতরণের পরিমান দাঁড়ায় ৯১.৯ বিলিয়ন টাকা যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় শতকরা ২৮ ভাগ বেশি। গ্রামীণ ব্যাংক বর্তমানে ৪৫ হাজারেরও বেশি গ্রামে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বর্তমানে এ ব্যাংকটির ৯০ হাজারেরও বেশি ঋণসুবিধাভোগীই মহিলা। বাংলাদেশে গ্রামীণ-এর গোষ্ঠীভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণকারী বড় ধরনের ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারীদের মধ্যে আছে এক মিলিয়নেরও অধিক সদস্যবিশিষ্ট একটি এনজিও ব্র্যাক এবং প্রায় ৫ লক্ষ সদস্যের মধ্যে ক্ষুদ্রঋণ সরবরাহকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি)। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ‘থানা সম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান প্রকল্প’ (থারডেপ) বাস্তবায়ন করছে, যা এর লক্ষ্যগোষ্ঠীকে সংগঠিত করার জন্য পরিবারভিত্তিক পদ্ধতিতে ক্ষুদ্রঋণ সরবরাহ করছে। এনজিওদের পরিচালিত দারিদ্র বিমোচন কর্মসূচিসমূহে তারা তাদের লক্ষ্যগোষ্ঠী নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে লিঙ্গ (যথা, গ্রামীণ ব্যাংক), পেশা (যথা, ব্র্যাক) অথবা সংখ্যাগত পরিমাণ (যথা, বিআরডিবি) ইত্যাদি বিবেচনা করে।

গোষ্ঠীভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের অধীনে ঋণগ্রহীতাদের ঋণ গ্রহণের উপযুক্ত হওয়ার জন্য পাঁচ জনের এক একটি দল গঠন করতে হয় এবং তাদের নিজেদের সঞ্চয় সংগ্রহ করতে হয়। সাপ্তাহিক ভিত্তিতে সংগৃহীত এ সঞ্চয়ের পরিমাণ প্রতি সপ্তাহে সদস্যপ্রতি এক থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। গোষ্ঠীভিত্তিক এবং পরিবারভিত্তিক লাভজনক উপার্জনমুখী কার্যক্রম চিহ্নিতকরণে প্রশিক্ষণ, উৎপাদন ও বিপণন সংগঠন এবং মৌলিক দক্ষতা উন্নয়নের মতো সহায়ক সেবাও প্রদান করে থাকে। অন্যান্য সহায়ক সেবার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সামাজিক সচেতনতা, পরিবার পরিকল্পনা, শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং পরিবেশ সচেতনতা কার্যক্রম।

বিআরডিবি বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ এবং সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে সরকারি খাতের বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান। এটি ঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অন্যান্য সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে পল্লীর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য তাদেরকে সমবায় এবং অনানুষ্ঠানিক দল গঠনের মাধ্যমে সংগঠিত করে। এদের লক্ষ্যগোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ০.৫ একর পর্যন্ত জমির মালিক ক্ষুদ্র কৃষক এবং বিত্তহীন মহিলা ও পুরুষ। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম ২০১০ সালেও অব্যহত রয়েছে। সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকসমূহ এ ঋণ বিতরণ ও আদায়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে থাকে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এই ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮,৩৭৫.৮৪ কোটি টাকা। বিআরডিবি’র ঋণ আদায়ের হার শতকরা ৯৪ ভাগ। মূলত প্রশিক্ষণ এবং প্রায়োগিক গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড) এবং বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ)-এই প্রতিষ্ঠান দুটিও ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে থাকে। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত এ দুটি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিতরণকৃত মোট ঋণের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৯২০ মিলিয়ন টাকা এবং ৩৫ মিলিয়ন টাকা, তাদের আদায়ের হার ছিল ৯৮%। অন্য যে সকল সরকারি সংস্থা ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেগুলি হচ্ছে বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়, দপ্তর এবং দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে গঠিত কিছু সংস্থা। পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন একাই অংশীদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংযুক্ত ২৫৭টি এনজিও-র মাধ্যমে প্রায় ৮৫ লক্ষ গ্রহীতাকে ক্ষুদ্রঋণ সরবরাহ করেছে। কিছু সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৭৬-২০০০ মেয়াদে ৩৬৩টি এনজিও (এমএফআই)-এর মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণকারী সকল সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৫ মিলিয়ন অতিক্রম করে যায়। ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত এ ঋণ গ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ১৫ মিলিয়ন। যে সকল কার্যক্রমের জন্য ক্ষুদ্রঋণ মঞ্জুর বা ব্যবহার করা হয়, সেগুলি হচ্ছে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য, পল্লী পরিবহণ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও ব্যবসায়, গৃহনির্মাণ, গ্রামীণ বনায়ন, হাঁসমুরগি পালন, সেবা এবং অন্যান্য অকৃষি স্বকর্মসংস্থান ও উপার্জনমুখী বিভিন্ন জীবিকা। যে সকল আইনের অধীনে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী এনজিও নিবন্ধন করা হয় সেগুলি হচ্ছে সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট ১৮৬০, কোম্পানি অ্যাক্ট ১৯৯৪, কো-অপারেটিভ সোসাইটিজ অ্যাক্ট ১৯৮৪, চ্যারিটেবল আ্যন্ড রিলিজিয়াস ট্রাস্ট অ্যাক্ট ১৯২০, এবং ট্রাস্ট অ্যাক্ট ১৮৮২। বিভিন্ন বিদেশি উৎস থেকে অনুদান গ্রহণেচ্ছু এনজিওসমূহকে ফরেন ডোনেশন্স (ভলান্টারি অ্যাক্টিভিটিজ) রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স ১৯৭৮-এর অধীনে এনজিও-বিষয়ক ব্যুরোতে নিবন্ধন করা হয়।

এমএফআইসমূহের ঋণ লেনদেনের একটি ব্যয় রয়েছে। ঋণগ্রহীতা চিহ্নিতকরণ ও নির্বাচন এবং ঋণ আদায়ের উঁচু হার সংরক্ষণের মতো জটিল কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয়ও যথেষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, গোষ্ঠীভিত্তিক ঋণ প্রদান করতে সামাজিক মধ্যস্থতা, দল গঠন, প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য ঋণবহির্ভূত কার্যক্রমের প্রয়োজন হয়। ব্যক্তিগতভাবে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণকারীর মধ্যে এক ধরনের দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার জন্য এ সকল কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। অধিক লেনদেন ব্যয়ের কারণে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিসমূহ ভর্তুকি-সমর্থিত সম্পদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশেষত, এমএফআইসমূহের প্রদত্ত ঋণের ওপরে ধার্যকৃত সুদহার হয় প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ-উৎসগুলির সুদহারের সমপর্যায়ের বা তার চেয়েও বেশি।

বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, দরিদ্ররা সঞ্চয় করতে পারে, তারা ঋণ পাওয়ার যোগ্য এবং তাদের মধ্যে পুরুষদের তুলনায় মহিলা ঋণগ্রহীতাগণ কম ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের কর্মসূচি অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে উচ্চহার সুদে ধার গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে এবং দরিদ্রদের অর্থায়নের পথ সুগম করেছে। ক্ষুদ্রঋণ এ অর্থে সঠিক লক্ষ্যাভিসারী, সমাজ থেকে পর্যায়ক্রমে দারিদ্র্য দূর করাই তার প্রকৃত লক্ষ্য। ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বিতরণকৃত মোট ক্ষুদ্রঋণের মধ্যে ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষিরা পেয়েছে ৭৪%, ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের চাষিরা পেয়েছে ২২% এবং বড় চাষিরা পেয়েছে মাত্র ৪%। পক্ষান্তরে, ব্যাংকসমূহ কর্তৃক সরবরাহকৃত ঋণের মধ্যে বড় (২.৫% একরের অধিক ভূমির মালিক) চাষিদের অংশ ছিল আনুমানিক ৮৫%, ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের (০.৫ একরের বেশি কিন্তু ২.৫ একরের কম ভূমির মালিক) চাষিরা পেয়েছে ১৩% এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা পেয়েছে মাত্র ২%।

সূত্রঃ বাংলাপিডিয়া

Leave a Reply