রমজানের শিক্ষা: প্রকৃতি ও বিকৃতি ৩য় পর্ব

0
193

আযান না সাইরেন: বাংলাদেশে রমজান মাসে সাহরির সময় ঘুম থেকে জাগানো, সাহরীর শেষ সময় সম্পর্কে অবহিতকরণ এবং ইফতারের সময় সাইরেন বাজানোর রেওয়াজ চলে আসছে কয়েক দশক ধরে। এর শরয়ী স্ট্যাটাস সর্ম্পকে কোন গবেষণা ছাড়াই সম্ভবত: এ রসম চালু হয় প্রথম কিছু মসজিদে। শুরুর দিকে ‘মন্দ কি?’ ধাচের প্রবণতা থেকেই দেখাদেখি প্রায় সকল মসজিদেই মাইক লাগানোর পাশাপাশি সাইরেন সুবিধাও যুক্ত হয়। সময়ের ব্যবধানে অপ্রয়োজন বিবেচনায় আবার অনেক মসজিদ থেকে বিদায় হয়েছে মাইকের ব্যবহার।কিন্তু তবুও কারো কারো হুঁশ যেন হবারই নয়। গোঁ ধরেই আছেন যেন বাঁচবেন তো সাইরেন নিয়েই বাঁচবেন।

মনে রাখতে হবে রোজা যেমন একটি ইবাদাত সাহরী ইফতারও তাই। নিয়মানুযায়ী কোন ইবাদাত পালনের ক্ষেত্রে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা:)অনুসৃত কর্ম প্রক্রিয়া, তার নির্দেশ এবং অনুমোদনকে আদর্শ ধরেই পালন করার চেষ্টা করব। রোযার প্রারিম্ভিক আচার সাহরী খাওয়া আর প্রান্তিক আচার ইফতার করা। রাসূলের যুগে সাহরীর সময় শেষ হলে একবার এবং ফজরের নামাজেরর জন্য আরেকবার আযান দেয়া হতো। আর ইফতারও করা হতো আযান দিয়ে আজানের সাথে সাথে। এখন লোকদের সুবিধার কথা বলে এর সাথে সাইরেন যোগ করা কি আদৌ বৈধ হতে পারে?

আযান প্রর্বতনের ইতিহাস: নামাজের সময় অবহিতকরণমূলক যে আযানের সাথে আমরা পরিচতি এবং অভ্যস্থ তার প্রর্বতনের প্রেক্ষাপট জানলে বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কার হবে। হিজরতের পর মদীনায় মুসলমানদের অবস্থানে স্থিতিশীলতা আসার পর মসজিদে দৈনন্দিন ৫ ওয়াক্ত নামাজে মুসলমানরা সময়মত স্বতস্ফুর্তভাবে হাজির হতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তে থাকা এবং কর্ম ব্যস্ততা ও অবস্থানগত দূরত্বের মাঝেও নামাজের জন্য যাতে মুসলমানরা একই সময়ে হাজির হতে পারে সেজন্য নামাজের সময় অবহিতকরণমূলক কোন ব্যবস্থা প্রর্বতনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা:) একদিন এ বিষয়ে মসজিদে নববীতে ওপেন ফ্লোর আলোচনা উপস্থাপন করে সকলের পক্ষ পরামর্শ আহবান করেন। তখন উপস্থিত সাহাবীদের কেউ প্রস্তাব করেন নামাজের সময় হলে ঘন্টা বাজানোর। কেউ প্রস্তাব করলেন আগুণ প্রজ্বলিত করার। আবার কেউ প্রস্তাব করেন নামাজের সময় হলে সিঙ্গা ফুৎকারের। ঘন্টা বাজানোর খুষ্টানদের এবং আগুণ জ্বালনো অগ্নি পূজকদের, এবং সিঙ্গা বাজানো ইয়াহুদীদের ধর্মীয় সংস্কৃতি তাই তা রাসূল সা: এক এক করে এসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। হযরত ওমার (রা:) অলিগলিতে নামাজের ঘোষণা দিতে লোক পাঠানোর প্রস্তাব করেন। আবার কেউ প্রস্তাব করেন নামাজের সময় হলে মসজিদে পতাকা উত্তলনের । এ দু’টিও রাসূলুল্লাহ (সা:) মনপূত: না হওয়ায় সেদিনকার মত তিনি সভা মূলতবি ঘোষণা করেন।

এই রাতেই আব্দুল্লাহ বিন যায়দ (রাঃ) স্বপ্নে দেখলেন, এক ব্যক্তি সিঙ্গা হাতে যাচ্ছে (কোন কোন বর্ণনায় ঘন্টার কথা বলা হয়েছে)। আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ বলেন, আমি তাকে বললাম, ‘হে আল্লাহর বান্দা! ঘন্টাটি বিক্রয় করবে?’ লোকটি বলল, ‘এটা নিয়ে কি করবে?’ আমি বললাম, ‘ওটা দিয়ে লোকেদেরকে নামাযের জন্য আহ্বান করব।’ লোকটি বলল, ‘আমি তোমাকে এর চাইতে উত্তম জিনিসের কথা বলে দেব না কি?’ আমি বললাম, ‘অবশ্যই।’ তখন ঐ ব্যক্তি আব্দুল্লাহকে আযান ও ইকামত শিখিয়ে দিল। অতঃপর সকাল হলে তিনি রসূল (সাঃ) এর নিকট উপস্থিত হয়ে স্বপ্নের কথা খুলে বললেন। সব কিছু শুনে মহানবী (সাঃ) বললেন, “ইনশাআল্লাহ! এটি সত্য স্বপ্ন। অতএব তুমি বিলালের সাথে দাঁড়াও এবং স্বপ্নে যেমন (আযান) শুনেছ ঠিক তেমনি বিলালকে শেখাও; সে ঐ সব বলে আযান দিক। কারণ, বিলালের আওয়াজ তোমার চেয়ে উচ্চ।”

অতঃপর আব্দুল্লাহ (রাঃ) স্বপ্নে প্রাপ্ত আযানের ঐ শব্দগুলো বিলাল (রাঃ) কে শুনাতে লাগলেন এবং বিলাল (রাঃ) উচ্চস্বরে আযান দিতে শুরু করলেন। উমার (রাঃ) নিজ ঘর হতেই আযানের শব্দ শুনতে পেয়ে চাদর ছেঁচড়ে (তাড়াতাড়ি) বের হয়ে মহানবী (সাঃ) এর নিকট উপস্থিত হলেন; বললেন, ‘সেই সত্তার কসম, হে আল্লাহর রসূল! আমিও স্বপ্নে ঐরূপ দেখেছি।’ আল্লাহর রসূল (সাঃ) তাঁকে বললেন, “অতএব যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহরই।” (আহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান ৪৯৮-৪৯৯, তিরমিযী, সুনান ১৮৯, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ৭০৬নং)। এভাবেই আযান ইসলামী শিয়ারের অর্ন্তভূক্ত হয় যা শব্দগতভাবে মাধুর্যপূর্ণ এবং অর্থগতভাবে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার এক স্পর্ধিত উচ্চারণ।

সাইরেন নিয়ে কথা: এবার আলোচনা করা যাক সাইরেন নিয়ে। বাংলা একাডেমী English-Bangla Dictionary তে Siren এর অর্থ করা হয়েছে “(গ্রীক পুরাণ) ডানা বিশিষ্ট নারী, এদের গান নাবিকদের মুগ্ধ করে তাদের বিনাশ সাধন করত(এর থেকে) মোহিনী নারী। সতর্কবার্তা ও সংকেত প্রেরণের জন্য জাহাজের বাঁশি, তীব্র, উঁচু প্রলম্বিত সতর্ক ধনি; এই ধ্বনি সৃষ্টিকারী যন্ত্র; সাইরেন। এ ব্যাপারে আরে জানা যায় যে গ্রিক পুরাণ মতে, সাইরেন বা মহাসমুদ্রের মৎস্যকন্যা হলো খুব বিপদজ্জনক এবং সুন্দরী গায়িকা যারা তাদের দ্বীপের পাশ দিয়ে অতিক্রান্ত জাহাজের যাত্রীদের সুরের মায়াজাল সৃষ্টির মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে আকর্ষণ করত। তাদের গানের গলা এতই চমৎকার ছিল যে সেই গান নাবিকদের কানে পৌঁছালে নাবিকরা সেই দ্বীপের দিকেই ধাবমান হতো এবং সেই জাহাজ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে সবাই মৃত্যুবরণ করত। বিভিন্ন সূত্রে সাইরেনদেরকে নদী দেবতা একিলেপাসের কন্যা বলা হয়েছে। হোমারের ওডিসিতে সাইরেনদের ঊর্ধ্বাংশ মানবী এবং নিম্নাংশ পাখির মতো দেখতে বলা হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য সূত্রে সাইরেনদের দেহের ঊর্ধ্বাংশ মানবী এবং নিম্নাংশ মাছের মতো বলে জানা যায়। সাইরেনরা সাইরেনিয়া নামক একটি দ্বীপে বাস করত।

বুঝাই যাচ্ছে সাইরেনের উৎপত্তিগত এবং ব্যবহারিক অর্থে নেতিবাচক প্রধান্য বিদমান। বর্তমান সময়েও অগ্নিকান্ড/কারাদ্রোহ, শত্রু পক্ষের বিমান আক্রমণ থেকে নগরবাসিকে সতর্ককরণের কাজে সাইরেন বাজানো হয়। অগ্নি নির্বাপক গাড়ি, এম্বুলেন্স, পলিশের রায়টকার সাইরেন বাজাতে বাজাতে দৌড়ায়্। যা সচরাচর জনমনে ভীতির উদ্ভব ঘটায়। এটি এমন একটি যন্ত্র যার তীব্র আকষ্মিক শব্দ, শব্দ কেন্দ্রের নিকটবর্তি সুস্থ মানুষের অন্তরাত্নায় কাঁপন ধরিয়ে দেয়। সেখানে অসুস্থ মানুষের কথা কথা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। আর পৃথিবীর কিয়ামত তথা মহাপ্রলয়েও বাজবে সেই সিঙ্গা বা সাইরেনই।

রাসূল (সা:) নামাজে আহবানের জন্য ঘন্টা/সিঙ্গা ব্যবহারের প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাই রমজান মাসে সাহরী ইফতারির সময় জানানোর জন্য আযানের বিকল্প হিসেবে সেই সিঙ্গার আধুনিক সংস্করণ সাইরেনের ব্যববহার সাহরী-ইফতারির ভাবগাম্বির্যতায় একবারেই বেমানান এবং জায়েজ হবার তো প্রশ্নই আসে না। এর স্বপক্ষে মনগড়া কোন যুক্তি গ্রহণের সুযোগ নেই। এবাদত যা কিছু তা সবই মানকুল তথা যেমনি রাসূলের যুগে ছিল তাই হবহু মানার বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ। মনগড়া যুক্তি দিয়ে কেউ তাতে নতুন কিছু যুক্ত করতে চাইলে তা শরীয়ার দৃষ্টিতে হবে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত।

রাসূলের সুন্নাত: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা:) হতে বর্নিত, তিনি বলেন রাসুল(সা:) বলেছেন ‘বিলালের আযান বা আহ্ববান যেন তোমাদের কাউকে সেহরী থেকে বিরত না রাখে। কেননা তার আযানে (তাহাজ্জুদে রত) মুসাল্লি লোকেরা বাড়ি ফিরে যায় এবং ঘুমন্ত লোকেরা জাগ্রত হয়’ (বুখারি; কিতাবুল আযান; মুসলিম শরীফ; কিতাবুল সওম; হা/২৪১৪; মিশকাত; কিতাবুল আযান; তিরমিযী; কিতাবুল সওম। মুসলিম শরীফের আরেকটি হাদিসে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে থেকে যারা নিদ্রিত তাদের জাগান এবং যারা তাহাজ্জুদ নামাযে লিপ্ত তাদের বিরত করাই বিলালের আযানের উদ্দেশ্য’(কিতাবুল সওম; হা/২৪১৬)। আর ইবনে মাজাহতে এভাবে আছে, ‘বেলালের আযান যেন তোমাদের কাউকে সাহরী খাওয়া থেকে বিরত না রাখে। কেননা, সে তোমাদের ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগাবার বা সতর্ক করার জন্য এবং তোমাদের নামাযীকে নামাযে রত হওয়ার জন্য আযান দিয়ে থাকে’(কিতাবুল সিয়াম;হা/১৬৯৬)।

তাহলে এই হাদিসগুলো থেকে কয়েকটি ব্যাপার পরিস্কার হয়ে গেল। তা’হল রাসুল(সা) এর দুই জন মুয়াজ্জিন ছিলেন একজন বেলাল(রা) যিনি রাতে তাহাজ্জুদের এবং সহরী খেতে মানুষকে জাগানোর জন্য আযান দিতেন আর অন্ধ সাহাবী উম্মে মাকতুম(রা) ফজরের জন্য আযান দিতেন। তাহাজ্জুদের আযান দেওয়ার তিনটি উদ্দেশ্য ছিল-
১. তাহাজ্জুদের জন্য মানুষকে আহ্ববান করা
২. যারা রাত থেকে তাহাজ্জুদ পড়ছে তাদের বিরত করা
৩. ঘুমন্ত ব্যক্তিদের সহরী খাওয়ার জন্য জাগানো।
অথচ আমরা আজ কি করছি? সুন্নাত অনুযায়ী, আযান না দিয়ে কেউ সাইরেন বাজাচ্ছি আবার কেউ মাইকে “ঘুম থেকে জেগে উঠুন, শুয়ে পড়ুন সাহরী খাবার সময় হলো কিংবা সাহরীরর সময় শেষ হলো” বলে চিৎকার করছি। এর সবই সুন্নাতে রাসূলের বিকল্প হিসেব দাড় করানোর চেষ্টা তাই বিদ’আত। তাই সাহরীর সময় সাইরেন, গজল বা ওয়াজ নসিহাত করে লোককে জাগিয়ে বিদ’আত না করে আযান দিয়ে সুন্নাত জিন্দা করাই হবে সর্বোত্তম কাজ।

রমজানের মূল এবং প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে আল্লাহর ভয় অন্তরে ধারণ করার অনুশীলন। কেউ না দেখুক আল্লাহ দেখছেন তাই আল্লাহর আদেশ অমান্য করা এবং নিষেধ লংঘন করা কোনটাই করতে পারে না কোন রোজাদার। অথচ মাস পরিসমাপ্তির সাথে সাথে এক মাসের সাধনা এবং ধারণ করা সকল শিক্ষা ভুলে ঈদ নিয়েই তামাশা শুর করে দেয়। আছে ঈদ নিয়ে রোজা না রাখাদের নির্লজ্জ বাড়াবাড়িও। নির্মল আনন্দ আর ভাব গাম্ভির্যের ঈদ পরিণত হয় হিন্দুদের পূজা পার্বন আর অন্যান্য উৎসবের আদলে। আর বাকি এগারো মাস দেখলে মনে করার কোন কারণ থাকে না এই সমাজে একমাস রোজাও ছিল।

লেখকঃ মো: মোসলেহ উদ্দিন
একজন ব্যাংকার

Leave a Reply