নতুন ব্যাংকগুলোর জন্মই আজন্ম পাপ হয়ে গেছে

0
251

যাত্রার চার বছর পূর্ণ করা নতুন ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়ন-সংক্রান্ত কর্মশালাটি যেন পরিণত হয়েছিল অনুমোদন বিতর্ক ও অনিয়ম নিয়ে। বারবার ঘুরেফিরে আসে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ও ফারমার্স ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে এসব ব্যাংকের মামলার বিষয়টিও আসে আলোচনায়। অনেকে ব্যাংক অনুমোদনের বিতর্ক তুলে ধরে বলেন, ব্যাংক ব্যবসা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘নতুন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পারফরমেন্স মূল্যায়ন’ শীর্ষক কর্মশালায় গতকাল এসব আলোচনা হয়।

উন্মুক্ত আলোচনায় এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহমুদ হোসেন বলেন, নতুন ব্যাংকগুলোর জন্মই আজন্ম পাপ হয়ে গেছে। যে প্রেক্ষাপটে ব্যাংকগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, সেই বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। এত প্রতিকূলতা নিয়ে চলতে হয়, এগিয়ে যাওয়া কঠিন। উদ্যোক্তারা ৪০০ কোটি টাকা দিয়েছে, এ জন্য সবাই আগ্রাসী ব্যাংকিং করছে। বেশি শাখা খুলছে, ঋণও বেশি। লাগামহীন যে দৌড় শুরু হয়েছে, তার লাগাম টানা উচিত।

কর্মশালার উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী। বিআইবিএমের মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক মো. সোহেল মোস্তফা।

এস কে সুর চৌধুরী বলেন, নতুন নয় ব্যাংকের মধ্যে দুই-তিনটির অবস্থা খুবই নাজুক। তবে এখনই বলার সময় আসেনি যে নতুন এই ব্যাংকগুলোর অবস্থা খুবই দুর্বল বা ভালো। যে দুই-তিনটি ব্যাংকে বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে। পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সার্বিকভাবে তাদের তদারকি করা হচ্ছে।

এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মেহমুদ হোসেন বলেন, ২০১৩-১৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। ২০১৫ ও ১৬ সালে কিছুটা ব্যবসা করা গেছে। এখন পর্যন্ত কোনো বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে নস্ট্রো হিসাব খোলা যায়নি। হিসাব খুলতে গেলেই জন্মের প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক পরিচয় এসব প্রশ্ন আসে। নতুন ব্যাংকগুলোকে নানা শর্ত দিয়ে আটকে ফেলা হয়েছে, এখন এসব শর্ত তুলে দেওয়ার সময় এসেছে।

মেঘনা ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ‘যখন নতুন ব্যাংকগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন আমিও বিরোধিতা করেছিলাম। কিন্তু নতুন ব্যাংক তো নতুন কেউ পরিচালনা করছে না। কর্মী সবই পুরোনো। এ জন্য নতুন ব্যাংক বলে ব্যবসা খারাপ, এটা বলে পার পাওয়া যাবে না। তবে এটা সত্যি ৪ বছরেও আমরা বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা চালু করতে পারিনি।’

নুরুল আমিন বলেন, এখন আর কেউ ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে চায় না। মানুষের মন পরিবর্তন হয়ে গেছে। যারা ঋণখেলাপি তাদের বয়কট করতে হবে। সামাজিকভাবে না পারলেও তাদের রাজনৈতিকভাবে বয়কট করতে হবে। ব্যাংকগুলোতে পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা মিলেই এসব সংকট নিরসন করতে হবে।

বিআইবিএমের সুপারনিউমারি অধ্যাপক হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, যথাযথ নিয়মকানুন ছাড়া ঋণ বিতরণ করা যাবে না। নিয়ম হলো, কোনো ব্যাংক এক গ্রাহককে সীমার বেশি ঋণ দিতে পারবে না। ওই গ্রাহক যদি সব ব্যাংক থেকে ঋণসুবিধা নেয়, তাহলে ওই গ্রাহকের ঋণ কত দাঁড়ায়। এটা ভাবতে হবে।

বিআইবিএমের অপর অধ্যাপক ইয়াসীন আলী বলেন, নতুন ব্যাংকের অনেক পরিচালক বেনামে ঋণ নিচ্ছেন। অনেকে ঋণ নিয়ে টাকা পাচার করছেন। এসব বন্ধ করতে হবে। এনআরবি ব্যাংকগুলো বলেছিল, বিদেশ থেকে আমানত আনবে। কিছুই আনতে পারেনি। সময় হলে ব্যাংকগুলোকে একীভূত করতে হবে। নিজে না করলে জোরপূর্বক একীভূত করার উদ্যোগ নিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ভারতের মতো দেশে টাকা থাকলেও ব্যাংক পাওয়া যায় না। কারা ব্যাংক নেবে, তারা কী জনগণের আমানতের সুরক্ষা দিতে পারবে এসব দেখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তা দেখা হয় না। বাংলাদেশে যেসব ব্যাংক খারাপ করছে তাদের একীভূত করা যেতে পারে। তবে দেশে একীভূত করার আইন নেই। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে।

বিআইবিএমের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক অনুমোদনের চূড়ান্ত ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের। তবে সরকারের চাপে অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বছর শেষে নয়টি নতুন ব্যাংকের শাখা হয়েছে ৩৬০টি। ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমানত রয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংকে ৭ হাজার ১২৫ কোটি, ফারমার্স ব্যাংকে ৫ হাজার ৬৩ কোটি ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে ৪ হাজার ৪২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে দুটি ব্যাংকেই বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে।

সূত্রঃ প্রথম আলো

Leave a Reply