ইসলামী ব্যাংকের অধিগ্রহণ আর্থিক খাতে ভীতি সঞ্চার করেছে

0
2104

ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশঃ দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ কৌশল ও সংশ্লিষ্ট বিধি-ব্যবস্থায় ব্যাপক অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ নানামুখী সমস্যার মুখে রয়েছে। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন উভয় ক্ষেত্রেই এসব সমস্যা বিদ্যমান। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই বিধি আরোপ, পরস্পরবিরোধী নিয়ম-কানুন, নিয়মের নানামুখী ব্যাখ্যা, অভিযোগ মোকাবিলার ব্যবস্থা না থাকার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের সম্পদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এসব অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে। নতুন মালিক ও ব্যবস্থাপকদের দ্বারা ইসলামী ব্যাংক অধিগ্রহণের মতো ঘটনা এরই উহাদরণ। ইসলামী ব্যাংককে এভাবে অধিগ্রহণ করার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও সার্বিক আর্থিক খাতে ভীতি সঞ্চার করেছে।

বিশ্বব্যাংক ও ইউকে-এইডের সহায়তায় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) এক গবেষণায় এসব কথা বলা হয়েছে। রেগুলেটরি আনপ্রেডিক্টিবিলিটি অব বাংলাদেশ শীর্ষক গবেষণাটি গত ১৩/১০/২০১৭ পিআরআই’র বনানী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান মনসুর।

সাবেক তত্তাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন আইন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শহীদুল হক। অন্যান্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ, বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতবিষয়ক প্রধান বিশেষজ্ঞ সৈয়দ আখতার মাহমুদ, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহীম, বর্তমান সভাপতি আবুল কাসেম খান, বিআইডিএসের গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ, সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রমুখ।

গবেষণা প্রতিবেদনে পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান মনসুর বলেন, আর্থিক ও সুশাসন বিষয়ে বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার মধ্যে ব্যাপক অ-অনুমেয়তা (আনপ্রেডিক্টিবিলিটি) বিদ্যমান। এগুলোর কারণে ব্যবসার খরচ বেশি হচ্ছে, উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে, অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগ অনুৎসাহিত হচ্ছে এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে।

প্রতিবেদনে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার মধ্যে মোট ছয়টি অ-অনুমেয় অবস্থার কথা বলা হয়। বলা হয়, নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে অধিকাংশই স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই ঘোষণা করা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আলোচনা করা হলেও তার বাস্তবায়ন হয় না। গবেষণার জন্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি জরিপ করা হয়েছে উল্লেখ করে আহসান মনসুর বলেন, দেখা গেছে প্রায় শতভাগ উদ্যোক্তা মনে করেন তাদের পরামর্শ ও প্রত্যাশা নীতি প্রণয়নে প্রতিফলিত হয় না। এমনকি নীতি প্রণয়নের পর তাতে কতটুকু অভিমত প্রতিফলিত হয়েছে, তা পর্যালোচনাও হয় না। এছাড়া বাংলাদেশে জমি ও অন্যান্য সম্পদের মালিকানার অধিকার সুরক্ষা পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। কোরিয়ান রফতানি প্রক্রিয়াকরণ জোনে দেখা গেছে, স্থানীয়রা উদ্যোক্তাদের জমি দখল করেছেন। ১৯৯০ দশকের শুরুর দিকে কাফকোর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে একই ঘটনা। এছাড়া সাম্প্রতিক নতুন মালিক ও ব্যবস্থাপকরা যেভাবে ইসলামী ব্যাংক অধিগ্রহণ করেছেন, তা বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং সার্বিক আর্থিক খাতের ওপর ভীতি সঞ্চার করেছে।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুতে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানায় আকস্মিক পরিবর্তন হয়। সেখানে একটি শীর্ষ ব্যবসায় গ্রæপ ব্যাংকের মালিকানা অধিগ্রহণ করে এর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনে।

সভায় সভাপতির বক্তব্যে মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, নীতিগত বিষয়ে এক ধরনের অনুমেয়তা থাকা উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। আমি যখন সরকারের দায়িত্বে ছিলাম, তখন দেখেছি পূর্ব-পর্যালোচনা এবং স্পষ্টতা থাকলে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।

উপস্থিত বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছে। পরিসংখ্যানিকভাবে হয়তো মধ্যম আয়ে উন্নীত হচ্ছে। কিন্তু মধ্যম আয়ের দেশের যে আচরণ, তা এখনও বাংলাদেশ করতে পারছে না। নীতি ও আইনি ব্যবস্থায় অনুমেয়তা থাকা একটি মধ্যম আয়ের দেশের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। তারা বলেন, সরকারের প্রধান কাজই হলো নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা। ছোট-বড় সব উদ্যোক্তার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে নীতি প্রণয়ন করা এবং বাস্তবায়ন করা দরকার। আমাদের দেশে দেখা যায়, বড় বড় উদ্যোক্তারা তথ্য পান। অন্যদিকে একটা বিষয়ের ওপর কয়েকটি এসআরও বা নির্দেশনা থাকায় কোথায় তা সংরক্ষিত আছে, সে তথ্যও পান না ছোট ব্যবসায়ীরা। তাছাড়া একেক বিষয়ে হাজারটা এসআরও রয়েছে। এগুলো পর্যালোচনা করে সহজভাবে তুলে ধরা জরুরি।

সূত্রঃ শেয়ার বিজ

Leave a Reply