ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো ভাল করছেঃ বাংলাদেশ ব্যাংক

0
1323

গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ রবিবার প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে দেশের বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা এগিয়ে রয়েছে বলে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমানত, ঋণ বিতরণ, প্রবৃদ্ধি এবং ব্যবসা সকল ক্ষেত্রেই এ ধারার ব্যাংকগুলো শক্ত ভিত্তি তৈরী করেছে অন্যান্যদের তুলনায়।

বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মভীরুতা একটি বড় বিষয়। আর এ বিষয়ে সবাই একমত হবে যে, ধর্মভীরু মানুষ সুদকে এড়িয়ে চলতে চায়। যেখানে সুদের বিকল্প মুনাফা ভিত্তিক ব্যাংক এখন বাংলাদেশেই আছে, সেখানে যারা সুদকে এড়িয়ে চলতে চান তারা ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো পছন্দ করেন। যে কারণে ইসলামীক ব্যাংকের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে দিন দিন। পাশাপাশি কাস্টমারদের ধরে রাখার জন্যও ব্যাংকগুলো তাদের সেবার মান বাড়িয়েছে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্রতিবেদন যথাযথ বলে মনে করেছেন বিশ্লেষকরা।

সচ্ছতার দিক দিয়ে যেহেতু ইসলামীক ব্যাংকিং এগিয়ে, তাই এসব ব্যাংকে ডিপোজিটের পরিমানটাও বেশি। ফলে এসকল ব্যাংকের বিনিয়োগের পরিমান যেমন বেশি-প্রবৃদ্ধির পরিমানটাও তেমন বেশি।

বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো হলো- ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, এক্সিম ব্যাংক লিমিটেড, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেড ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক লিমিটেড।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকিং সেক্টরের প্রবৃদ্ধির জন্য সততা খুব দরকার। আর সচ্ছতার দিক দিয়ে ইসলামীক ধারার ব্যাংকগুলো অনেক এগিয়ে। যে কারনে অমুসলিমরাও এসকল ব্যাংকে আগ্রহ প্রকাশ করছে।

আমাদের দেশের বেশিরভাগ লোকই ধর্মভীরু। এই দেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত বাস্তব একটি প্রতিবেদন। তাছাড়া এ ধারার ব্যাংকগুলোতে ব্যবস্থাপণা অনেক উন্নত। যোগ্যতা ও দক্ষতার দিক দিয়ে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই এরা। এছাড়া ব্যাংকগুলো তুলনামূলক মিতব্যয়ীও।

তিনি আরও বলেন, সচ্ছতার দিক দিয়ে যেহেতু ইসলামীক ব্যাংকিং এগিয়ে, তাই এসব ব্যাংকে ডিপোজিটের পরিমানটাও বেশি। ফলে এসকল ব্যাংকের বিনিয়োগের পরিমান যেমন বেশি-প্রবৃদ্ধির পরিমানটাও তেমন বেশি। বড় একটি কোম্পানির(নাম প্রকাশ না করার শর্তে) উদাহরন দিয়ে তিনি বলেন, কোম্পানিটি সম্প্রতি একটি বানিজ্যিক ব্যাংকের সুদ শাখা থেকে ইসলামী শাখায় যাওয়ার আবেদন করেছে। তার মানে হলো-বানিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেও ইসলামীক সেকশন ভালো পারফর্ম করছে। তাই ইসলামী শাখার সংখ্যা আরও বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন প্রান্তিকের তথ্য নিয়ে ২৪ সেপ্টেম্বর এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে দেখা গেছে, ২০১৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে মোট আমানতের ২২ দশমিক ১০ শতাংশ ছিল ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর। চলতি বছরের জুনে এ আমানতের অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৭২ শতাংশে।

এছাড়া শাখা বৃদ্ধি ও ঋণ বিতরণেও ইসলামি ব্যাংকগুলোর অংশ বেড়েছে।তাছাড়া অতিরিক্ত তারল্য নিয়ে প্রচলিত ব্যাংকগুলো বিপদে থাকলেও সংকটে নেই ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো। ২০১৫ সাল শেষে এই ব্যাংকগুলোয় যেখানে অতিরিক্ত তারল্য ছিল ১৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। এখন সেখানে অতিরিক্ত তারল্য আছে সাত হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত মোট ঋণের ২৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ বিতরণ করে ইসলামি ব্যাংকগুলো। চলতি বছরের জুনে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৯৮ শতাংশে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর মোট শাখার ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ এখন ইসলামি ব্যাংকিং করছে। গত বছর জুনে এ হার ছিল ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ঋণ ও আমানতের মতো শাখার ক্ষেত্রেও ইসলামি ব্যাংকগুলোর অংশীদারিত্বও বেড়েছে।

এছাড়া, রেমিট্যান্স আহরণে ৩০ দশমিক ৮৮ শতাংশই ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর অবদান। এ ব্যাংকগুলোতে গত এক বছরে নতুন করে কর্মসংস্থান হয়েছে এক হাজার ৪৯২ জনের। বর্তমানে দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে আটটি পূর্ণাঙ্গ ধারার ইসলামি ব্যাংক। এছাড়া দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রচলিত ধারার ৯টি ব্যাংক চালু করেছে ইসলামি ব্যাংকিং শাখা, আটটি ব্যাংক চালু করেছে ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো। দেশের ব্যাংকিং খাতের এক-পঞ্চমাংশই এখন নিয়ন্ত্রণ করছে ইসলামি ধারার এ ব্যাংকগুলো।

প্রতিবেদনে অনুযায়ী, গত জুনে ব্যাংকগুলোর কাছে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল আট লাখ ৭৭ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের আমানত এক লাখ ৯৯ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময় পর্যন্ত ইসলামি ব্যাংকগুলোতে আমানত ছিল এক লাখ ৭৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সব ব্যাংক মিলে ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময় পর্যন্ত বিতরণ করা মোট ঋণের মধ্যে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের অংশ ছিল ২৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশব্যাপী সব ব্যাংকের শাখার সংখ্যা ৯ হাজার ৭২০টি। এর মধ্যে ইসলামি ধারার ব্যাংকের শাখা আছে এক হাজার ১১২টি। যা মোট শাখার ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এসব শাখার মধ্যে পুরোদমে ইসলামি ধারার ব্যাংকিং আছে এক হাজার ৬৮টি। এর বাইরে প্রচলিত ধারার বেশ কয়েকটি ব্যাংকের ১৯টি ইসলামি ব্যাংকিং শাখা রয়েছে। আর ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো খুলে কাজ করছে ২৫টি শাখা।

Leave a Reply