আবারও ব্যাংকের আইন বদল মালিকদের স্বার্থে

0
273

ব্যাংক কোম্পানি আইন আবার সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বরাবরের মতো এবারের উদ্যোগও বেসরকারি ব্যাংকের মালিকদের স্বার্থে। বর্তমানে ব্যাংকে একই পরিবারের দুজনের বেশি পরিচালক হতে পারেন না। সংশোধনের মাধ্যমে তা চারজন করা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তাব

* ব্যাংকে এক পরিবার থেকে ২ পরিচালক * পরিচালক পদে ২ মেয়াদে সর্বোচ্চ ৬ বছর

অর্থ মন্ত্রণালয় যা করছে

* ব্যাংকে এক পরিবার থেকে ৪ পরিচালক * পরিচালক পদে ৩ মেয়াদে সর্বোচ্চ ৯ বছর

আবার বর্তমানে পরিচালকেরা তিন বছর করে দুই মেয়াদে ছয় বছর পরিচালক থাকতে পারেন। তিন বছর বিরতি, তারপর আবারও পরিচালক হতে পারেন। সংশোধন হয়ে সেটি হচ্ছে তিন বছর করে তিন মেয়াদে নয় বছর এবং এরপর তিন বছর বিরতি দিয়ে তিন মেয়াদে আবার নয় বছর।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) দাবি ও তোড়জোড়ের মুখেই ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। জানা গেছে, বিভাগটি এরই মধ্যে সংশোধনীর একটি খসড়া অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে উপস্থাপন করেছে এবং অর্থমন্ত্রী তাতে অনুমোদনও দিয়েছেন। আরও কিছু ঘষামাজা করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ পুরো বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বিএবি প্রায় ছয় মাস ধরে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। বিএবির দাবি আরও বেশি। সেগুলো হচ্ছে—ব্যাংকের পরিচালকদের মেয়াদ আজীবন করা, একই পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে সীমা না রাখা এবং পরিচালক হওয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিল করা।

ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ পাস হওয়ার পর থেকে বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালকদের মেয়াদ সম্পর্কিত ধারাটি এখন পর্যন্ত পাঁচবার সংশোধন করা হয়েছে। এ ধারায় ব্যাংকের পর্ষদে একজন পরিচালক কত বছর পরিচালক থাকতে পারবেন, সে কথা বলা রয়েছে। সর্বশেষ ধারাটি সংশোধন হয় ২০১৩ সালে। এবারেরটি ষষ্ঠবারের মতো উদ্যোগ।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বারবার আইন পরিবর্তন করে ব্যাংকগুলোকে পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। ফলে ব্যাংকিং আইনকানুন মানার প্রয়োজন মনে করছেন না অনেক পরিচালক। অনেকের মৌখিক নির্দেশে বড় বড় ঋণ বিতরণ ও সিদ্ধান্ত হচ্ছে। এতে আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকও তাঁদের ক্ষমতার কাছে নিরুপায় হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ব্যাংকে যে পরিচালন মূলধন আছে তার মাত্র ১০ শতাংশ পরিচালকদের, বাকি অর্থ আমানতকারীদের। এ জন্য ১০ শতাংশ মূলধনের মালিকদের সব সময় পরিচালক থাকার প্রয়োজন নেই। ভারতের আইনেও দুই মেয়াদের বেশি থাকার সুযোগ নেই। আমানতকারীদের স্বার্থে আইনে পরিবর্তন আনা ঠিক হবে না।

ইব্রাহিম খালেদ আরও বলেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ যেন পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে না পড়ে, এ জন্যই আইনে দুজনের বেশি থাকার সুযোগ দেওয়া হয়নি। গ্রাহকদের স্বার্থেই আইনে এমনটি রাখা হয়েছে। ব্যাংকের পরিচালকদের মানসিকতায় এমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি, যার ফলে আইন পরিবর্তন করতে হবে।

জানা গেছে, আইন সংশোধনের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামতকে খুব একটা আমলে নিচ্ছে না ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। একটি বিষয়ে অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মনোভাব একই। সেটি হচ্ছে, পরিচালক হওয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় আমাদের মতামত চেয়েছিল। ব্যাংক খাতের স্বার্থের দিক বিবেচনা করে আমরা মতামত জানিয়ে দিয়েছি।’ এর বাইরে কোনো কথা বলতে চাননি তিনি।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে পাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামতে দেখা যায়, পরিচালক নিয়োগের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নেওয়ার যুক্তি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ব্যাংকের বেশির ভাগ তহবিলের জোগান আসে যেহেতু আমানতকারীদের কাছ থেকে, তাই আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তার জন্যই উপযুক্ত ও পেশাগতভাবে দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হওয়া দরকার।

পরিচালক সংখ্যাও একই পরিবার থেকে দুয়ের বেশি না করার যুক্তি দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এতে কোনো ব্যাংক একই পরিবারের মধ্যে কুক্ষিগত হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বরং একজন পরিচালক একাধারে দুই মেয়াদে ছয় বছর দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিশ্চিত করার পক্ষে। বর্তমানে কেউ ছয় বছরের কম সময় দায়িত্ব পালন করলেও তা পূর্ণ মেয়াদ হিসেবে গণ্য হওয়ার বিধান রয়েছে—বাংলাদেশ ব্যাংক এটা তুলে দেওয়ার পক্ষে।

যোগাযোগ করলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং ১৯৯৬ সালের ব্যাংক সংস্কার কমিটির চেয়ারম্যান ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘যে বিবেচনায় ব্যাংক সংস্কার কমিটি আগে পরিচালকদের সংখ্যা কম রাখার সুপারিশ করেছিল, সেই পরিস্থিতি যদি এখনো অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে আইন সংশোধনের আগে সরকারকে আরও গভীর বিচারবিশ্লেষণ ও গবেষণা করতে হবে।’

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, শুধুই স্টেকহোল্ডারদের (মালিকপক্ষ) দাবির মুখে আইন পরিবর্তন করা ঠিক হবে না। আবার এও খেয়াল রাখতে হবে যে আইনের নতুন সংশোধনের ফলে মালিকপক্ষের জন্য পাছে না অন্যায় সুযোগ তৈরি হয়।

ব্যাংক সংস্কার কমিটি বেসরকারি ব্যাংক অংশের সুপারিশে বলেছিল, ‘একই পরিবারের একাধিক সদস্য পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হতে পারবেন না। পরিবার বলতে স্বামী/স্ত্রী এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল পুত্র, কন্যা, পিতামাতা ও ভাইবোনকে বুঝাবে।’

যোগাযোগ করলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমান বলেন, ‘বিএবি যেসব দাবি জানিয়েছিল, সেগুলো নিয়ে ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো সংশোধন করা যায় কি না বা কতটা সংশোধন করা যায়, তা এখনো পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।’

বিভিন্ন সময়ের সংশোধন

ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী পরিচালকদের তিন বছর করে দুই মেয়াদে ছয় বছর পদে থাকার কথা বলা হয়। ছয় বছর শেষে তিন বছরের বিরতি দিয়ে আবার তাঁরা পরিচালক হতে পারেন। আইন পাস হওয়ার পরপরই বিরোধিতা শুরু করেন ব্যাংকের উদ্যোক্তারা এবং সরকারের কাছে আজীবন পরিচালক থাকার দাবি জানান। ১৯৯৩ সালে আইন সংশোধন হয় এবং ধারাটি পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয় এবং ২০০৩ পর্যন্ত ধারাটির বাস্তবায়ন হয়নি। এ সময়ে পরিচালকেরা ইচ্ছেমতো দায়িত্ব পালন ও ব্যাংকের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতেন।

আইনটি ২০০৩ সালে আবার সংশোধন করে বলা হয়, কোনো পরিচালক একাধারে দুই মেয়াদে ছয় বছরের বেশি পদে থাকতে পারবেন না এবং কোনো একটি মেয়াদের আংশিক মেয়াদও পূর্ণ মেয়াদ হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ তিন বছর মেয়াদ হলেও কেউ এর চেয়ে কম সময় দায়িত্ব পালন করলে এটা তাঁর পূর্ণ মেয়াদ হিসেবে গণ্য হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালে একটি অধ্যাদেশ জারি করে, যাতে বলা হয় দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন শেষে এক মেয়াদ বিরতি দিয়ে নতুন করে পরিচালক হতে হবে। কেউ দুই মেয়াদের বেশি পরিচালক পদে থাকলে অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার এক বছর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিচালক পদ শূন্য হয়ে যাবে। এ অধ্যাদেশ জারির পর অনেকেই পরিচালক পদ হারান।

২০০৯ সালে অধ্যাদেশটি আর জাতীয় সংসদে পাস হয়নি। ফলে ২০০৩ সালের সংশোধিত ধারাতেই ফিরে যায় ব্যাংক কোম্পানি আইন এবং ২০১৩ সাল পর্যন্ত এ আইনেই চলতে থাকে।

এরপর ২০১৩ সালে আইনটি আবার সংশোধন হয়। এবার বলা হয়, পরিচালকদের মেয়াদ হবে তিন বছর ও দুই মেয়াদে পরিচালক থাকা যাবে। তিন বছর বিরতি দিয়ে আবার পরিচালক হওয়া যাবে।

বিএবির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি যে উদ্যোক্তারা যত দিন চান তত দিন তাঁদের পদে থাকার সুযোগ দেওয়া হোক। এ সুযোগ দিলে আইনটি বারবার সংশোধনের প্রয়োজন পড়ত না। আমরা নিজেদের অর্থায়নে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছি, কেন মেয়াদের প্রশ্ন আসবে। কেউ কি নিজের উদ্যোগে গড়া প্রতিষ্ঠান অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে চান? আর ছেলেমেয়েরা স্বাবলম্বী হলে তাঁদের পরিচালক হতে বাধা কোথায়?’

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সরকারকে ভেবেচিন্তে আইনটি সংশোধন করতে হবে। সুশাসনের জন্য অন্তরায় হয় এবং ব্যাংক খাতে আস্থাহীনতা তৈরি হয়, এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে না।’ আমানতকারী ও ঋণ গ্রহণকারীদের স্বার্থ কীভাবে রক্ষা পায়, সেদিকেই বেশি নজর দেওয়া দরকার বলে মনে করেন সালেহউদ্দিন আহমেদ।

সূত্রঃ প্রথম আলো

Leave a Reply